বাগর্থবিজ্ঞানের স্বরূপ : বিভিন্ন জ্ঞানশাখার প্রাসঙ্গিকতা
Abstract
ভাষাবিজ্ঞানীরা (Linguist's) ভাষাকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেছেন। এসব সংজ্ঞা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, ভাষার সংজ্ঞাতেই অর্থের অস্তিত্ব রয়েছে। ভাষার উদ্ভব পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মানুষের মনের ভাব প্রকাশের জন্যে ভাষার সৃষ্টি। 'মনের ভাব বাক্যাংশটি অর্থকে নির্দেশ করে। অর্থাৎ অর্থ প্রকাশই মানব ভাষার একমাত্র এবং প্রধান উদ্দেশ্য। এজন্যে অর্থকে পরিহার করলে ভাষার সংজ্ঞা সম্পূর্ণতা লাভে ব্যর্থ হয়। এসব পরিপ্রেক্ষিতে ভাষাবিজ্ঞানে বাগর্থবিজ্ঞান বিশেষ গুরুত্বসহ আলোচনার দাবীদার। ভাষার অর্থ সংক্রান্ত আলোচনা বাগর্থবিজ্ঞান (Semanties) নামে পরিচিত। বাগর্থবিজ্ঞান ভাষাবিজ্ঞানের একটি অন্যতম প্রধান শাখা। গ্রিক বিশেষ্যবাচক শব্দ 'সিমা' (Sema) এবং ক্রিয়াবাচক শব্দ 'সিমেইন্স' (Semains) থেকে ইংরেজি সিমানটিক্স (Semantics) শব্দের উৎপত্তি। 'সিমা' শব্দের অর্থ সংকেত, ইঙ্গিত ইত্যাদি। অন্যদিকে ‘সিমেইন্স' শব্দের অর্থ সংকেত দ্বারা জ্ঞাপন বা প্রেরণ বা পরিচালনা করা, অর্থ প্রকাশ করা, অর্থ বোঝান ইত্যাদি। ইংরেজি ভাষার 'Semanties' শব্দটির পরিভাষা হিসেবে বাংলা ভাষায় শব্দার্থবিজ্ঞান, বাগর্থবিজ্ঞান, অর্থবিজ্ঞান, অর্থতত্ত্ব ইত্যাদি পরিভাষা প্রচলিত রয়েছে। এসব পরিভাষার মধ্যে বাগর্থবিজ্ঞান পরিভাষাটি বেশী গ্রহণযোগ্য। কেননা 'শব্দার্থ' বললে শুধু শব্দের অর্থ বোঝায়। অন্যদিকে 'অর্থতত্ত্ব' শব্দটি বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। Economics সম্পর্কে 'অর্থ' শব্দের বহুল প্রচলন আছে। বাগর্থবিজ্ঞান শব্দটি প্রচলনের ক্ষেত্রে বিজনবিহারী ভট্টাচার্য বাগর্থবিজ্ঞান প্রবন্ধে নিজস্ব যুক্তি উপস্থাপন। তাঁর মতে, বহুল ব্যবহৃত শব্দ অপেক্ষা অনতি প্রচলিতের ভিত্তিতে, বক্তার অল্প আয়াসে অভিপ্রেত ভাবের অধিকতম অংশ প্রকাশ করার ক্ষমতার গুণে, শ্রুতিমাধুর্যের জন্যে এবং মহাকবি কালিদাস কর্তৃক ব্যবহৃত হবার কারণে 'Semantics' শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে 'বাগর্থবিজ্ঞান' শব্দটি গ্রহণীয় হওয়া উচিত। ভাষার অর্থ সংক্রান্ত আলোচনা ধ্বনি, শব্দ বা বাক্যের আলোচনার মতো বিচ্ছিন্ন ভাবে করা সম্ভব নয়। কেননা ভাষার অর্থ পরিস্ফুট হয়ে ওঠে শব্দ ও বাক্যে। শব্দের স্বতন্ত্র অর্থ-থাকলেও সর্বদা একটি অর্থ থাকে না। অনেক শব্দেরই একাধিক অর্থ থাকতে পারে এবং এসব অর্থের মধ্যে কোন অর্থটি শব্দটির জন্য কখন যথার্থ তা শব্দটি বাক্যে প্রযুক্ত হলে বোঝা যায়। যেমন, 'বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে' ‘পাকা' শব্দটির ২১টি অর্থ দেয়া আছে। এসব অর্থের মধ্যে রয়েছে—পরিণত হওয়া, বৃদ্ধ হওয়া, ঝানু হওয়া, নিপুণ বা দক্ষ হওয়া, অভিজ্ঞ, পারদর্শী, অপরিবর্তনীয়, নিখাদ, খাঁটি' ইত্যাদি। এসব অর্থের মধ্যে শব্দটি কখন কোন অর্থ ধারণ করবে তা নির্ভর করছে বাক্যে শব্দটি কি অর্থে ব্যবহৃত হবে তার উপর। যেমন নীলার গহনাগুলি পাকা সোনার তৈরি। এ বাক্যে ‘পাকা' শব্দটি খাঁটি বা নিখাদ অর্থ বোঝাচ্ছে এবং শব্দটির অর্থ বাক্যে প্রয়োগ দেখে বোঝা যায়। সুতরাং অর্থের আলোচনা বাক্ সংগঠনের উপর ভিত্তি করে আলোচিত হওয়া উচিত এবং এ আলোচনাকে 'বাগর্থবিজ্ঞান' নামে আখ্যায়িত করাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত।
Downloads
Downloads
Published
Issue
Section
License
Copyright (c) 1999 সাহিত্য পত্রিকা - Shahitto Potrika | University of Dhaka

This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivatives 4.0 International License.