সতীনাথ ভাদুড়ীর ছোটগল্পে দাম্পত্যজীবনচিত্র
Abstract
আর্থ-সামাজিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত নর-নারীর বিশেষ এক সম্পর্কের নাম দাম্পত্য। তাই 'দাম্পত্য কেবল স্বয়ম্ভু নর-নারী সম্পর্ক নয়, বরং তা সমাজ মনস্তত্ত্ব নির্ধারিত ও আর্থনীতিক-সংস্কৃতি সৃষ্ট একটি প্রতিষ্ঠান'। এ প্রতিষ্ঠান ব্যক্তির পারস্পরিক নির্ভরতা আর বিশ্বাস, কামনা-প্রাপ্তি, আনন্দ-সুখ এবং মোহ আর মায়াকাব্যের জালে অঙ্গীকারাবদ্ধ। বিবাহের মধ্য দিয়েই মানুষের দ্বিতীয় জীবনের যে সূচনা, বলা যায়, সেই জীবনের নাম দাম্পত্য। সাহিত্য সমাজবিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। তাই বাংলা সাহিত্যে বিশেষত কথাসাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় দাম্পত্যজীবন অনুষঙ্গের বিচিত্র রূপ, বিবিধ সংকট উপস্থাপনের দৃষ্টান্ত বিরল নয়। উপন্যাসের ক্ষেত্রে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর বিষবৃক্ষ (১৮৭৩) ও কৃষ্ণকান্তের উইল (১৮৭৮) উপন্যাসদ্বয়ে নরনারীর দাম্পত্যজীবন সংকটের যে স্বরূপ উন্মোচন করেছেন তাতে আর্থ-সমাজ সংশ্লিষ্ট বাস্তবতা গুরুত্ব পেয়েছে সর্বাধিক। পরবর্তী সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর চোখের বালি (১৯০৩) উপন্যাসে এতদসংক্রান্ত জট- জটিলতাকে মনস্তত্ত্বের গূঢ় ব্যঞ্জনায় প্রকাশ করেছেন। একইভাবে ছোটগল্পেও রবীন্দ্রনাথ নরনারীর দাম্পত্য সম্পর্কের নানা প্রান্ত চিত্রণ করেছেন। বিশেষ করে আর্থ-সমাজ কাঠামোর পরিমণ্ডলে রচিত ‘একরাত্রি' (১৮৯১), 'শাস্তি' (১৮৯৩), ‘মধ্যবর্তিনী' (১৮৯৩) প্রভৃতি গল্পে দাম্পত্য সম্পর্কের কিছু সমস্যা রূপলাভ করেছে। উনিশ শতকে রচিত এ সকল গল্পের ‘সমস্যাগুলির মধ্যে অনেকক্ষেত্রেই একটি সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতা বর্তমান'। কিন্তু বিশ শতকের প্রারম্ভিক পর্যায়ে রচিত ছোটগল্পে রবীন্দ্রনাথ দাম্পত্যজীবন সংকট উন্মোচনে মনস্তাত্ত্বিক পরিপ্রেক্ষিতকে গুরুত্ব দিয়েছেন সর্বাধিক। ‘তাঁর নিজ অভিজ্ঞতার জগৎ নাগরিক মধ্যবিত্ত-জীবন এ পর্যায়ের গল্পে ক্রমাগত প্ৰাধান্য লাভ করেছে। মানব-মানবীর রোম্যান্টিক হৃদয়-রহস্য, দ্বৈত প্রেমাবেগ, ঈর্ষা-দ্বেষ-ঘৃণার আবর্তন রবীন্দ্রনাথের পরিবর্তিত জীবনদৃষ্টির কাছে অনেকটা তাৎপর্যহীন হয়ে পড়েছে'। 'নষ্টনীড়' (১৯০১) গল্পে চারুর প্রতি স্বামী ভূপতির ঔদাসীন্য, দেবর অমলের সঙ্গে নিঃসঙ্গ চারুর গড়ে ওঠা মধুর সম্পর্ক যা ক্রমে দুর্নিবার ভালোবাসায় পরিণত হয়েছে, আর চারু ও ভূপতির অজান্তেই তাদের নীড় ভেঙে যাচ্ছে - সেই শৃঙ্খলিত দাম্পত্যজীবনের সূত্রগুলোকে নিপুণভাবে উপস্থাপনে এই পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গির ভূমিকাই মুখ্য। রবীন্দ্র-পরবর্তী ছোটগল্পের ধারায় নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত, জগদীশ গুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র এমনকি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় দাম্পত্যজীবনের বহুমাত্রিক স্তর এবং বহুভঙ্গিম দৃষ্টিকোণ তুলে ধরেছেন তাঁদের রচনায়। অসুস্থ, ক্লেদাক্ত দাম্পত্যজীবনের বিচিত্র সংকট জগদীশ গুপ্ত ও নরেশচন্দ্রের গল্পে লক্ষ করা যায়। অপরদিকে দাম্পত্যজীবনে ত্রিকোণ প্রেমের সমস্যা ও জটিল রহস্যময় রূপ নির্মোহ দৃষ্টিতে উন্মোচিত হয়েছে প্রেমেন্দ্র মিত্র ও মানিকের গল্পে।
Downloads
Downloads