নজরুল-প্রবন্ধে বিদ্রূপের স্বরূপ
Abstract
কাজী নজরুল ইসলাম মূলত কবি; এমনকি তাঁর গদ্যেও তিনি প্রবলভাবে কবিস্বভাবী । রোমান্টিকের প্রকৃতি-প্রেম-সৌন্দর্যচেতনা, আত্ম-আবিষ্কারের উচ্ছ্বলতা নজরুলের কবিতা ও গানকে যতটা প্লাবিত করেছে প্রবন্ধকে ততটা না করলেও তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন সেখানেও প্রবল জোয়ার সৃষ্টি করে। প্রবন্ধের ক্ষেত্রে যে বস্তুনিষ্ঠতা, যুক্তি ও চিন্তার নৈর্ব্যক্তিকতা এবং গভীরতা আবশ্যক তা সর্বাংশে অনুসরণ করার মতো যত্নশীল নজরুল নন বলেই চূড়ান্ত বিচারে এগুলোকে প্রবন্ধ বলা যায় কিনা সে প্রশ্ন বারবারই উঠেছে। তবে নজরুল নিজেই যখন কিছুটা পরিমার্জনার পর প্রবন্ধ হিসেবে কিছু লেখা প্রকাশ করেন অথবা নিখাদ প্রবন্ধ হিসেবেই কয়েকটি রচনা লেখেন তখন সেগুলো প্রবন্ধকার নজরুলের মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সাময়িক প্রয়োজন বা সামাজিক কারণে লিখিত হলেও তা নজরুলেরই ব্যক্তিত্বকে প্রকারান্তরে প্রতিফলিত করে বলে এ জাতীয় রচনাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হয়। বিশেষত আমরা যখন অবগত হই যে, নজরুলের প্রবন্ধ রচনা প্রকৃতপক্ষে তাঁর সাংবাদিক জীবনের প্রতিভাস তখন এগুলো আলাদা তাৎপর্য পায়। কারণ বাংলা প্রবন্ধের সাথে সংবাদ সাময়িকীর রয়েছে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক; সাহিত্য ও সাংবাদিকতা পরস্পর পরিপূরক হয়ে সমৃদ্ধ করেছে বাংলা প্রবন্ধের প্রস্তুতি পর্বকে। উনিশ শতকের শেষার্ধের গণেশ দেউঙ্কর এবং ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়ের মতো প্রবন্ধকার; দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ, কৃষ্ণকুমার মিত্র, শিশিরকুমার ঘোষ-এর মতো প্রখ্যাত সাংবাদিক-প্রবন্ধকারদের উত্তরাধিকারী হিসেবে নজরুলের আত্মপ্রকাশ ঘটলেও তিনি মূলত সাহিত্যিক এবং তারপর প্রচারক-রাজনীতিক। রাজনীতি নজরুলের প্রবন্ধের সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়। ফলে ভাবোচ্ছ্বাসপূর্ণ জাগরণী বক্তব্য এসব প্রবন্ধে অনায়াসে জায়গা করে নিয়েছে। অনেকটা বিবেকানন্দের মতো উগ্র প্রচারক নজরুল, সমর্থক সন্ত্রাসবাদের। উচ্ছ্বাসময় লিখিত বক্তৃতার আঙ্গিকে তরুণদের আকৃষ্ট করার উজ্জীবনী মন্ত্র তিনি ছড়িয়েছেন গদ্যে। তাই সাময়িক পত্রের প্রয়োজন আর ‘গণরঞ্জন' এই দুয়ে মিলে নজরুলকে এক প্রচারমুখী সমাজমনস্ক সম্পাদকে পরিণত করেছিল । নজরুলের এসব লেখা আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার আরও কারণ হলো, এগুলোর মধ্যে তাঁর বিশেষ একটি রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় বিশ্বাসের পরিচয় মুদ্রিত। বিষয়গত দিক ছাড়াও নজরুলের বিশ্বাসের সঙ্গে প্রত্যয়জাত একটি চেতনা প্রবন্ধগুলি থেকে আবিষ্কার করা যায়' (মনজুর মোরশেদ, ১৯৯২ : ১)। রচনাগুলোর অধিকাংশই সাময়িক প্রয়োজনে লিখিত হলেও সাময়িকতার সীমা অতিক্রম করে কালোত্তীর্ণ হতে সক্ষম হয়েছে। গুণবিবেচনায় প্রবন্ধ, নিবন্ধ, অভিভাষণ, সম্পাদকীয় বা পুস্তক সমালোচনা যে নামেই অভিহিত হোক না কেন তাতে নজরুলের ব্যক্তিত্ব ও শৈলীর বিশেষত্ব ধরা পড়েছে বলেই এগুলো বিশদ আলোচনার দাবি রাখে।
Downloads
Downloads
Published
Issue
Section
License
Copyright (c) 2014 সাহিত্য পত্রিকা

This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivatives 4.0 International License.