মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী রচনাবলী
Abstract
আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পঞ্চাশের দশক ছিল যাকে বলে আবর্তসঙ্কুল ও উর্মিমুখর সে দশকেই আমাদের চিন্তা-চেতনার ক্ষেত্রে অভ্রান্ত সুস্থ মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির হলাহল সেদিন আমাদের সামগ্রিক জীবনধারাকে যেভাবে বিষিয়ে তুলছিল, তাতে মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর মত বিবেকবান মানুষরা আতংকিত না হয়ে পারেন নি। নির্ঝঞ্ঝাট জীবন যাপনে অভ্যস্ত, স্বল্পভাষী মোফাজ্জল হায়দার সেদিন বিবেকের আহ্বানেই যেন বলিষ্ঠ প্রতিবাদী আওয়াজ তুলে মানুষকে সর্বনাশের পথ থেকে নিবৃত্ত করতে এগিয়ে এসেছিলেন। ফলে অজাতশত্রু মোফাজ্জল হায়দারেরও শত্রুর জন্ম হল। তিনি অনেকের বিষ নজরে পড়লেন। তবু অকুতোভয় মোফাজ্জল হায়দার তার বিবেকের বাণী উচ্চারণ করে যেতে কখনোই দ্বিধাগ্রস্ত বোধ করেননি। পঞ্চাশ, উত্তাল দশক পেরিয়ে তিনি সত্তরের দশকের সূচনা পর্যন্ত অক্লান্তভাবে একজন crusader-এর ন্যায় লড়ে গিয়েছেন সকল প্রকার সংকীর্ণতা, অনুদারতা ও উন্মত্ততার বিরুদ্ধে। অবশেষে আততায়ীর হাতে প্রাণ দিয়ে আপন কর্মকাণ্ডের সার্থকতা প্রতিপন্ন করে গেলেন। প্রচার বিমুখ, সদা বিনম্র মানুষ মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী প্রকৃতই ছিলেন সত্যের একটি দীপশিখা, শত অন্ধকারের বুক চিরে যা নিজের পথ চিনে নিতে জান্ত। ছাত্র জীবনে অসামান্য কৃতিত্বের অধিকারী মোফাজ্জল হায়দার কোনদিনই ঐশ্বর্য বিলাসের স্বপ্ন দেখেন নি—তবু তিনি সুন্দরের স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসতেন। শান্তিনিকেতনের শিক্ষা তাঁকে ঐ প্রতিষ্ঠানের মহাস্থপতি রবীন্দ্রনাথের প্রশান্ত-উদার জীবনমন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিল অনেকখানি। সে শিক্ষার ঋণশোধ করতেই যেন আপনার চারপাশের অন্ধকারের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেছিলেন তিনি। শিক্ষাব্রত জীবনের সার করে নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্পণের মুহূর্ত থেকেই তিনি অবতীর্ণ হয়েছিলেন এক সংগ্রামীর ভূমিকায়। কখনই খুব সোচ্চার ছিলেন না হয়তো; কিন্তু ধীরে, সবিনয়ে দৃঢ়ভাবে সকল রকম মঢ়তার বিরুদ্ধে লেখনী চালিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। পেশাগত কারণেই বিভিন্ন সময়ে তিনি নানা ধরনের সৃষ্টিকর্মেও মনোযোগ দিয়েছিলেন, তা ঠিক। তবু স্বীকার করতে হয়, মোফাজ্জল হায়দার সৃষ্টিকর্মে সফল হওয়ার চেয়েও, বেশী মনোযোগী হয়ে পড়েছিলেন জাতি, সমাজ তথা দেশের মনের অর্গল খুলে দিতে। তাই মোফাজ্জল হায়দার কত বড় লেখক ছিলেন সে ভাবনা আমাদের মনে দেখা না দিলেও, তিনি যে কত বড় মানুষ ছিলেন, তা নিয়ে সত্তরের দশকের আগেই আমরা ভাবতে শুরু করেছিলাম। একাত্তরের শেষ লগ্নে পাকিস্তানী দুঃশাসকরা তাঁকে হত্যা করে তাঁর প্রবল আদর্শবাদী মানবসত্তাটিকেই প্রোজ্জ্বল করে রেখে গিয়েছেন। শহীদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মোফাজ্জল হায়দার আপন জীবনস্বপ্নকে চরিতার্থ করে গিয়েছেন।
Downloads
Downloads
Published
Issue
Section
License
Copyright (c) 1982 সাহিত্য পত্রিকা

This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivatives 4.0 International License.