আত্মার অমরত্ব : স্পিনোজা ও রবীন্দ্রনাথ
Abstract
অমরত্বলাভকে মানবজীবনের সর্বপ্রধান বা সর্বশ্রেষ্ঠ কাম্য বলা যায়। এ-জগতের বিভিন্ন মনীষী এ-অমরত্বকে বিভিন্নভাবে ধারণা করেছেন। কারো কারো ধারণা—অমরত্বলাভ মানুষের জন্মগত অধিকার। আবার কারো কারো ধারণা—এটি হচ্ছে ধর্মের অবদান। বিশেষ করে হিব্রু ধর্মগুলোতে অমরত্বকে ভগবানের এক বিশেষ অবদান বলে গণ্য করা হয়। এসব ধর্মগুলোতে পরকালের বিচার সম্বন্ধে সুস্পষ্ট ধারণা রয়েছে এবং প্রত্যেক মানব বা মানবীকে পরকালের বিচারের সম্মুখীন হতে হবে, এ-বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে; তা সত্ত্বেও এবংবিধ ভয়-ভীতির ঊর্ধ্বে অমরত্বকে একটি অবিসংবাদিত সত্য বলে গণ্য করা হয়েছে। মানুষ ব্যতীত অন্য কোন জীব-জন্তুর পক্ষে অমরত্ব সম্ভব নয় বলে এসব ধার্মিক লোকের ধারণা। এ-অমরত্বের স্বরূপ ও প্রকৃতি নিয়ে নানা মতভেদ রয়েছে। সাধারণতঃ অমরত্ব বলতে ব্যক্তিত্বের সংরক্ষণকেই বুঝায়। অর্থাৎ মৃত্যুর পরও আত্মার স্থিতি বুঝায়। মৃত্যুর সংগে সংগে নরদেহের বিলুপ্তি হলেও মানবাত্মা মৃত্যুর পরবর্তীকালেও অস্তিত্বশীল থাকে বলে মানুষের সাধারণ ধারণা রয়েছে। যদিও সাধারণতঃ বিশ্বাস করা হয় এ-দেহ নশ্বর, আত্মা অমর ও অবিনশ্বর। এ-থেকে স্বাভাবিকভাবেই অনুসিদ্ধান্ত করা হয়, এ-জগতে দেহ ও আত্মার সম্বন্ধ সম্পূর্ণ আকস্মিক। মানুষের দেহ ও আত্মার মধ্যে খুব নিবিড় সম্বন্ধ থাকলেও, পরস্পর থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে, এবং মৃত্যুর পরে মানবাত্মা স্বতন্ত্ৰ —ভাবে টিকে থাকতে পারে। কবি লফেলো [Poet Henry Wordsworth Longfellow] বহু আগেই বলে গেছেন, “মাটির দেহ মাটিতেই লয় হবে, কিন্তু একথা আত্মা সম্পর্কে বলা হয়নি (Dust thou art, to dust returnest, was not spoken of the soul)। এ-উক্তিটি কেবল কবি লফেলোর ব্যক্তিগত জীবন-প্রত্যয়ের প্রকাশ নয়। এ-হচ্ছে এ-বিশ্বের প্রায় সকল ধর্মাবলম্বী লোকের আন্তরিক বিশ্বাস। অবশ্য প্রত্যেক ধর্মের মধ্যেই আত্মার এ-স্বাতন্ত্র্য প্রত্যক্ষে বা পরোক্ষে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। তবে অভিজ্ঞতার দিক থেকে এ-প্রত্যয়ের কোন বিশিষ্ট প্রমাণ পেশ করা সম্ভবপর নয়। এ-প্রত্যয়কে মানবজীবনের একটা বিশেষ সান্ত্বন৷ বলে গণ্য করতে হয়। জীবনকালে যে-সব মানুষের দ্বারা অসাধ্য সাধন হয়, যাদের প্রতিভার দৌলতে এ-বিশ্ব নানাবিধ অবদানে সমৃদ্ধ হয়, মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই তাঁরা চিরকালের জন্য অবলুপ্ত হবে, এরূপ কোন আশঙ্কা৷ মানুষ সহ্য করতে পারে না। তাই যে-কোন অবস্থায় দেহ এবং আত্মাকে দুটো পৃথক বিষয় বলে ধারণা করে, দেহের ধ্বংসের পরেও আত্মার স্থিতি সম্বন্ধে প্রত্যয়শীল হয়েও মানুষ সান্ত্বনা লাভ করে। মনস্তাত্ত্বিক দিক দিয়ে তাই আত্মার অমরত্বের ধারণা এক হিসাবে অপরিহার্য। তবে তত্ত্বীয় দিক থেকে এ-ধারণার পোষকতায় কোন যুক্তির অবতারণা করা যায় কিনা, ভেবে দেখবার বিষয়। এ-ক্ষেত্রে এ ধারণার ভিত্তিতে যে-সব পদ (term) ও তাদের সম্বন্ধ রয়েছে, সেগুলো সম্বন্ধে আলোচনা করা প্রয়োজন। এতে স্বতঃসিদ্ধ হিসাবে ধরে নেওয়া হয়েছে মানুষের দেহ ও আত্মার সাময়িকভাবে মিলন ঘটলেও, তারা আদিতে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন, এবং একটির অভাবে অপরটির স্থিতি সম্ভবপর।
Downloads
Downloads
Published
Issue
Section
License
Copyright (c) 1982 সাহিত্য পত্রিকা

This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivatives 4.0 International License.