বাংলা রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান
Abstract
বাংলা সাহিত্যের সূচনা চর্যাপদ দিয়ে। চর্যাপদ ধর্মভিত্তিক সাহিত্যের পর্যায়ভুক্ত। কেননা চর্যাগুলো বৌদ্ধ সহজযান মতবাদকে ভিত্তি করে রচিত। “বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের উদ্দেশ্য ছিল, তাহাদের ধর্মের তত্ত্বকথা লোকায়ত ভাষায় জনসাধারণের চিত্তে পৌছাইয়া দেওয়া।” (বাঙ্গালীর ইতিহাস, নীহাররঞ্জন রায়)। চর্যাপদের পরিপূর্ণ বিকাশ বৌদ্ধ পাল রাজাদের আমলে - গোপাল (৭৫০ ) থেকে রামপাল ( আ. ১০৭৭-১১২০) পর্যন্ত। পালরা দুর্বল হয়ে পড়লে সেনরা বাংলায় আসন গেড়ে বসে। বার শতকের মাঝামাঝি সমগ্র বাংলা সেনদের আয়ত্তে আসে। সেন আমলে ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির এবং সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়েছে। ব্রাহ্মণ্য-আধিপত্যে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় সংস্কৃত সাহিত্য চর্চিত – জয়দেবের গীতগোবিন্দম্ বা ধোয়ীর পবনদূত এর উৎকৃষ্ট নজির। স্বভাবত চর্যাপদ দ্বারা চারশ বছর ধরে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশের যে সম্ভাবনা সূচিত হয়, সেন আমলে তা শুধু স্তিমিত নয়, স্তব্ধ হয়ে যায়। এজন্য সেকালে বাংলায় যে-সকল লৌকিক কাহিনী চণ্ডী, মনসা বা ধর্মঠাকুরের আখ্যান প্রচলিত ছিল, সেগুলো সাহিত্যিক রূপ লাভ করতে পারেনি। সেনদের পরাজিত করে মুসলমানরা রাজকীয় শক্তিরূপে এদেশে এল তের শতকের সূচনায় (১২০৩)। এবং এর ফলে বাংলা সাহিত্যে এক নতুন সম্ভাবনা দেখা দেয়। মুসলমান সুলতানগণ উদার মনোভাবাপন্ন বলে দেশজ সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করতে লাগলেন। মনসা, চণ্ডী, ধর্মঠাকুর, দক্ষিণ রায় প্রভৃতি লৌকিক দেব-দেবী নিয়ে মঙ্গলকাব্য, রাধা-কৃষ্ণের প্রণয়লীলা নিয়ে বৈষ্ণবপদ এবং মুসলমানি কেচ্ছা-কাহিনী নিয়ে পুঁথি সাহিত্য রচিত হতে থাকে। মুসলমানি পুঁথি সাহিত্যের মধ্যে নানারূপ কল্পনাশ্রিত বা রেমান্টিক কাহিনীকাব্য উল্লেখযোগ্য যেমন, ইউসুফ-জোলেখা, লায়লী-মজনু, সয়ফুলমুলুক বদিউজ্জামাল, পদ্মাবতী, চন্দ্রাবতী, হানিফা-কয়রাপরী, গুলে বকাওলী, বিদ্যাসুন্দর, মধুমালতী, সতীময়না-লোরচন্দ্রানী, গদা-মল্লিকা ইত্যাদি। পনের থেকে আঠার শতক এই চারশ বছর ধরে অসংখ্য পুঁথি রচিত হয়েছে। এদেশের স্যাৎসেঁতে আবহাওয়ার দরুন বহু পুঁথি নষ্ট হয়ে গেছে। আবার সংগৃহীত পুঁথির মধ্যেও সম্পাদিত পুঁথির সংখ্যা খুব বেশি নয়। আবদুল গফুর সিদ্দিকী, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, ড. এনামুল হক, ড. শহীদুল্লাহ, সৈয়দ আলী আহসান, ড. আহমদ শরীফ, সুলতান আহমদ ভূঁইয়া প্রমুখ কিছু কিছু পুঁথি সম্পাদনা করেছেন। এই সকল সম্পাদিত পুঁথি অবলম্বনে ওয়াকিল আহমদ রচনা করেছেন ‘বাংলা রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান'। সুকুমার সেন এবং মমতাজুর রহমান তরফদার মুসলমানি পুঁথিকে এই শিরোনামে চিহ্নিত করেছেন। অতএব ওয়াকিল আহমদ শিরোনামের ক্ষেত্রে তাঁদের অনুসরণ করেছেন। গ্রন্থটির ৪র্থ সংস্করণ ১৯৯৮–এ প্রকাশিত হয়েছে। ১ম সংস্করণ প্রকাশিত ১৯৭০, দ্বিতীয় ১৯৮৭-এ এবং তৃতীয় ১৯৯৫-এ। বাংলা রোমান্টিক কাহিনীকাব্য বা প্রণয়োপাখ্যান নিয়ে ইতঃপূর্বে কেউ কেউ স্বতন্ত্র বা বিচ্ছিন্ন প্রবন্ধ লিখেছেন; কিন্তু ওয়াকিল আহমদ বৃহৎ পরিসরে একটি সমগ্র ও সম্পূর্ণ আলোচনা করতে চেয়েছেন। অতএব মুসলমানি পুঁথি বিষয়ে তাঁর গ্রন্থটিকে আকর গ্রন্থের মর্যাদা দেয়া যায় এবং এ-কারণে গ্রন্থটি বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। লেখক গ্রন্থের প্রথমে একটি বিস্তৃত পটভূমি রচনা করেছেন। পুঁথির কাহিনীর উৎস সন্ধান করতে গিয়ে তিনি আরবি ফারসি কাব্যধারা, সংস্কৃত কাব্যধারা, হিন্দি-অবধি কাব্যধারা সন্ধান করেছেন। এমন কি ইউসুফ-জোলেখার কাহিনীর সূত্র সন্ধান করতে গিয়ে বাইবেলও তাঁর আলোচ্য বিষয় হয়েছে। পুঁথিগুলোর কাহিনীর উৎস সন্ধান করার পর লেখক এগুলোর মূলগত বৈশিষ্ট্য—একদিকে মানবরস, অপরদিকে অধ্যাত্মবাদ—দেখিয়েছেন এবং বাংলায় যে মানবতা প্রাধান্য লাভ করেছে, তাই তাঁর প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়েছে। বাংলার মাটিতে মানবরস বা human interest প্রাধান্য লাভ স্বাভাবিক। এরপর তিনি কাব্যের মধ্যে প্রেম ও সৌন্দর্য, চরিত্রচিত্রণ ও বিশ্লেষণ, শিল্পরীতি, ভাষারীতি নিয়ে আলোচনা করেছেন।
Downloads
Downloads
Published
Issue
Section
License
Copyright (c) 2024 সাহিত্য পত্রিকা - Shahitto Potrika | University of Dhaka

This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivatives 4.0 International License.