ষাটের দশকের কবিতা : বিষয় ও প্রকরণ
Abstract
পাপবোধ, পঙ্কিলতার গ্লানি, অবক্ষয়িত অন্তরাত্মার প্রতীতিতে একগুচ্ছ রোমশ অন্ধকারে বিচ্ছুরিত দ্যুতির মতো ছিটকে পড়েছেন ষাটের কবিরা। বিরুদ্ধ সময়, অনিকেত নিরবলম্ব অবস্থান, অগ্রজে অবিশ্বাস ক্রমান্বয়ে তাঁদের করেছে সংঘবিচ্ছিন্ন, আত্মমৈথুনে লিপ্ত, প্রথাবিরোধী, আত্মভুক চেতনায় উজ্জীবিত। কবিতার হৈ-চৈ, রাস্তা পোড়ানোর গন্ধ, বারুদের উত্তাপ, লাশ ও ডুয়ো পিঁপড়ের ঠান্ডা লড়াই, এবং সর্বোপরী লিবিডোর অন্তর্চাপ এসবই ষাটের কবিতার বহুল অনুষঙ্গ। ষাটের কবিদের কাছে তাই অগ্রাহ্য হয়েছে ধর্মবোধ, নীতিবোধ। জন্মলগ্নেই এঁরা প্রচলরীতির কাব্য স্রোতে অভিযোজন অক্ষম, স্থির জীবনদর্শনে পরান্মুখ, পূর্ববর্তী কবিদের মতো শুধু ইউরোপীয় আধুনিক নন্দনতত্ত্বে আস্থা প্রদর্শনে গভীরভাবে অনীহ। কবিদের এ মানসিকতার মূলে জাতিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিই প্রভাবক হিসেবে সক্রিয় থেকেছে। কারণ “পূর্ব বাংলার ছয়দশক পুঁজিবাদীদের শক্তিসঞ্চয়ের গুপ্ত প্রস্তুতিকাল, আর ইউরোপে তা পতনের চূড়ান্ত পর্যায়ে। সুতরাং অসম সমাজের দুই আদর্শ প্রান্তে জীবনের জ্যা পরাতে অগ্রসর হলেন ছয় দশকের কবিগণ।” সুতরাং ষাটের কবিরা একদিকে যেমন দেশজ জীবনবিন্যাসে, প্রচল বিশ্বাস ও মূল্যবোধে স্থিতিপাদ্ধ হতে পারেননি তেমনি অন্যদিকে সমকালকে আত্মস্থ ও মূল্যায়ন করে সুস্থিত দার্শনিক মীমাংসায় পৌঁছানো তাঁদের অন্বিষ্ট ছিল না “এদেশে বিজ্ঞান আছে বিজ্ঞানে বিশ্বাস নেই; ধর্ম আছে, তা বহু ব্যবহৃত; রাষ্ট্র আছে, রাজনীতি নেই; আদর্শ আছে অথচ কর্মযোগ নেই। ফলত অন্ধকার আচ্ছাদিত দৃষ্টিতে তাঁরা কাল সমাজজীবনকে দেখলেন। এ-দশকের কবিকূলকে তাই 'জন্মান্ধ' বলা অসার্থক নয়।” ষাটের কবিদের এই আত্মচারী, আত্মবিধ্বংসী, বোহেমীয় জীবনাচরণ তাঁদের জীবন-ঔদাসীন্যের বিলাসিতা নয় বরং এর সঙ্গে তৎকালীন সামাজিক, রাষ্ট্রনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ই সম্পৃক্ত। অবরুদ্ধ আইয়ুবী 'কালোদশক', পাকিস্তানি অখন্ডতার শ্লোগান, ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, বামপন্থী আন্দোলনের বিভক্তি, আমেরিকান পুঁজির বিস্তারে পূর্ববর্তী কবিদের বিচরণ প্রভৃতি সামাজিক ও নীয় অনুষঙ্গসমূহই ষাটের কবিদের করেছে শৃঙ্খলিত ও প্রতিবাদমুখর। এ-দশকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও দারুণ অস্থিতিশীল। আইয়ুব সরকারের দমননীতি, ‘মৌলিক গণতন্ত্ৰী', শাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন, নতুন শিক্ষাকমিশন রিপোর্টপ্রকাশজনিত পূর্ব বাংলার ছাত্র সমাজের সাংগ্রামিক পটভূমি, বাঙ্গালির স্বায়ত্ত শাসনের দাবি প্রভৃতির হল্লামুখরতায় রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল উত্তপ্ত। আর এ সঙ্গে বাঙ্গালি বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকাও হয়ে পড়ে খন্ডিত, "পুনর্জীবিত হয় ধর্ম, সাম্প্রদায়িকতা এবং অখন্ড পাকিস্তানের ধারণা। বুদ্ধিজীবীরাও আত্মবিক্রয় ও প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে গ্রহণ করেন সুবিধাবাদী ভূমিকা। অর্থাৎ ষাটের দশকের এই উপপর্বটি বাঙ্গালি জনগোষ্ঠী বা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কাছে কখনোই সদর্থক চেতনায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠতে পারেনি, না সংগ্রামে না চেতনায়।
Downloads
Downloads
Published
Issue
Section
License
Copyright (c) 2024 সাহিত্য পত্রিকা

This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivatives 4.0 International License.