রণেশ দাশগুপ্তের চিন্তায় ‘উপন্যাসের শিল্পরূপ' : একটি সমীক্ষণ
Abstract
বিশ শতকের তৃতীয় দশক থেকে বিশ্ব-উপন্যাসের ক্ষেত্রে শিল্পরূপগত সংকট তীব্রতর হয়, গুণাত্মক পরিবর্তন ও নতুনত্বের অভিঘাতে আন্দোলিত হয় এর দেহ-আত্মা। রণেশ দাশগুপ্ত এই দিক্-পরিবর্তনকে কেন্দ্রবিন্দু করে রচনা করেন দেশজ-বৈশ্বিক উপন্যাসের প্রেক্ষাপটসম্বলিত শিল্পরূপ বিবেচনাধর্মী গ্রন্থ 'উপন্যাসের শিল্পরূপ' (১৯৫৯), এটি বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিজাত আন্তর্জাতিক উপন্যাসধারার অন্তর্দর্শী পর্যালোচনা, যা বিশেষ তত্ত্বাদর্শ, মনস্বিতা ও নতুন জিজ্ঞাসার বৈপ্লবিক-প্রান্ত উন্মোচনে বিস্ময়কর। উপন্যাস-আলোচনার আন্তর্জাতিক-দেশজ প্রেক্ষাপটে এর তাৎপর্য পথিকৃৎ-স্বরূপ ; গভীর জ্ঞাননিষ্ঠা, পঠন-পাঠনের ব্যাপকতা, রসজ্ঞ-চিত্তের অন্তর্লীন সংস্পর্শ বক্তব্য বিষয়কে দিয়েছে নান্দনিক রসরূপ, কিন্তু এর কেন্দ্রগ-শক্তি হল দার্ঢ্য-যুক্তির সুগ্রন্থনা। পরিকল্পিত-কাঠামোর ভিত্তিতে বিন্যস্ত চিত্তাসমূহ সর্বমোট ছাব্বিশটি পরিচ্ছেদে (১৯৭৩, পরিবর্ধিত সংস্করণ) উপস্থাপিত। উপশিরোনামযুক্ত ব্যাখ্যামাল্যে উপন্যাসের শিল্পরূপ ও তার বিবর্তন ধারাটি পরস্পরিত রূপে বহমান থাকে মার্কসীয় জীবনবীক্ষায় এবং লেখকের আত্মদর্শী দৃষ্টিলোকে। বিশ শতকের বিশালকায় সৃষ্টি হিসেবে উপন্যাস ও তার অন্তর্গত জীবনজিজ্ঞাসা এখানে তন্তুজালের মত বিস্তৃত। বিশেষত ঐ কালপরিধিতে শ্রেষ্ঠ শিল্পমাধ্যমের অভিধাপ্রাপ্ত উপন্যাস তার গতিশীল, ইতিবাচক বিকাশ-লক্ষ্যকে ও স্বাতন্ত্র্য-সন্ধানকে কীভাবে গড়ে নিচ্ছে তারই আলেখ্য এই গ্রন্থ। বিগত দুই-তিন শত বৎসরের সৃষ্টিকর্মের সঙ্গে আজকের উপন্যাসের বিচ্ছিন্নতা বা সংযোগ-সূত্রের দ্বন্দ্বজটিল রূপটিও এখানে নিরীক্ষণ করা হয়েছে। সঙ্গতভাবেই আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে উপন্যাসের রূপগত বিবর্তনের ধারায় অন্যান্য শিল্পমাধ্যমের প্রভাবের চিহ্নসমূহ। উপন্যাস-ভাবনার ক্ষেত্রে গ্রন্থটির প্রাসঙ্গিকতা বা উপযোগিতা নির্ণয়ের সূত্রটি নির্ভরশীল প্রথমত এর চিন্তাপ্রবাহের সঙ্গে পরিচিতি লাভ করা যে-কোন সৃষ্টির শিল্পরূপ বিবেচনার মূল শর্ত জন্মকথার উন্মোচন, যেখানে সুপ্ত অবস্থায় রয়ে যায় বীজগর্ভ-শক্তি ও বিকাশ-পরম্পরার মৌল উপাদান। রণেশ দাশগুপ্ত বিশ্বগত মাত্রিকতায় উপন্যাসের চলিষ্ণু-রূপ উন্মোচনে উপন্যাসের উত্থান-ক্ষেত্র ও পর্যায়কে সন্ধান করেন, পৃথিবীর দেশে দেশে এর জন্ম-আয়োজনের যেসব প্রস্তুতি ও উপকরণ ছিল নেপথ্যে তার উদ্ঘাটনে তিনি গভীরতর অন্তদৃষ্টি ও সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ- ক্ষমতার পরিচয় দেন। সতের-আঠার শতকের ইউরোপে বিজ্ঞানের নব-নব আবিষ্কার, প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ, শিল্পবিপ্লবের পটে সামাজিক শ্রেণীসমূহের আভ্যন্তর দ্বন্দ্ব-বিরোধ এবং কতিপয় দেশে মাতৃভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র গঠনের পরিস্থিতি উপন্যাস-জন্মের প্রতিবেশ তৈরি করেছিল। বিশেষত, মুদ্রণযন্ত্র উপন্যাসের রূপের বন্ধনে গ্রন্থিবদ্ধ করেছে মধ্যযুগীয় রূপকথা-কেচ্ছা, কিংবদন্তি-উপাখ্যান, লোককথা, অলৌকিক বর্ণনা ইত্যাদি ধারা থেকে ছিন্ন করে উপন্যাসোচিত উপাদানকে। সাময়িকপত্রে ডায়েরি জাতীয় রচনাকর্মের প্রকাশ একে দিয়েছে গতিশীলতা ও ব্যাপকসংখ্যক পাঠক-সংস্পর্শ। ইতালির বোক্কাচিওর গল্পমালা, স্পেনের সার্ভেন্টিসের ‘ডন কুইক্সোট’, ফ্রান্সের রাবেলাইসের ‘গরগন্টুয়া ও পেন্টাগুয়েল' ইত্যাদি উপন্যাসের প্রস্তুতি-পর্বের মহান আয়োজন যাতে ছিল বাস্তবতার ব্যবহার, নরনারীর জীবন্ত অভিজ্ঞতার বৈচিত্র্য, কৌতুক-পরিহাস এবং সর্বোপরি লোকভাষার প্রয়োগ। গ্রন্থকার কৌতুকরস এবং লোকভাষাকে উপন্যাসের স্থায়ী উপাদান হিসেবে বিবেচনা করেন, যা একভাবে শিল্পরূপের সংকটকে প্রতিরুদ্ধ করতে সমর্থ, কেননা জীবনভিত্তির মূলীভূত শক্তি কৌতুকপ্রবণ-চিত্ত ও ব্যাপক লোকজীবন স্পৃষ্ট গদ্যের মধ্যেই প্রোথিত। উৎস- নির্দেশের সূত্রে সূচনা-পর্বে উপন্যাসে এই দুটি ইতিবাচক বীজকে সন্ধান করে পরবর্তীকালীন বিবর্তনকে করেন চিহ্নিত, অন্তত শিল্পরূপের প্রশ্নে উক্ত উপাদানদ্বয় লেখকের দৃষ্টিতে পায় স্থিতিস্থাপকতা।
Downloads
Downloads
Published
Issue
Section
License
Copyright (c) 2024 সাহিত্য পত্রিকা

This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivatives 4.0 International License.