বাংলা ভাষায় আরবি-ফারসি-তুর্কি-হিন্দি (উর্দু) শব্দের অভিধান (প্রথমাংশ)
Abstract
বাংলা ভাষার জন্ম ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে সপ্তম শতকে, ডঃ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে দশম শতকে। তখনকার বাংলা ভাষার ওপর ব্রাহ্মণ্যবাদের শোন দৃষ্টি পড়েছিল। ফলে সেকালের বাঙালিরা তাদের কথা সহজ ভাষায় বলতে পারেনি, একটু রহস্যের আড়াল অবলম্বন করতে হয়েছিল। চর্যাগীতিকার ভাষা রহস্যময় সন্ধ্যা ভাষা। তারপর বাংলাদেশ বিজিত হলো তের শতকের শুরুতেই বহিরাগত তুর্কি সেনাদের দ্বারা। তুর্কিরা ছিল ধর্মে ইসলাম অনুসারী, সংস্কৃতিতে পারসিক বা ফারসি। তাঁরা ঘরে তুর্কি ভাষা বলতেন, কিন্তু সরকারিভাবে ফারসি ভাষা বাবহার করতেন। আর ধর্মের ক্ষেত্রে তাঁরা আরবি ভাষা চালাতেন। এমনিভাবে রাজার ভাষার প্রভাব প্রজা সাধারণের ওপর পড়তে শুরু করে। তার প্রমাণ পাওয়া যায় চৌদ্দ শতকের শেষ দিকে রচিত বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে কয়েকটি আরবি-ফারসি শব্দ প্রয়োগ থেকে। আমরা জানি, হিন্দু ধর্মাবলম্বী সেন রাজারা, বাংলাদেশে মাতৃভাষায় সাহিত্যচর্চায় উৎসাহ দেখাননি। রাজসভায় কবিরা সংস্কৃত ভাষায় সাহিত্যচর্চা করতেন। কিন্তু অবস্থার পরিবর্তন ঘটে বাংলাদেশ মুহম্মদ বখতিয়ার খলজি কর্তৃক বিজিত হওয়ার পর (১২০১ সালে, মতান্তরে ১২০৩ সালে)। অবশ্য তখনও সমগ্র বাংলাদেশ বিজিত হয়নি। রাজা লক্ষ্মণ সেনের বংশধরেরা পূর্ববঙ্গের বিক্রমপুরে আরো প্রায় একশ' বছর পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। ১৩০১ সালে দিল্লির ফিরোজ শাহ যখন বাংলার সুলতান হলেন, তখন সমগ্র বাংলাদেশ বিহারসহ মুসলিম শাসনের অধীনে আসে। কিন্তু অন্তর্কলহে এই অবস্থা বেশিদিন টিকে থাকতে পারেনি। ১৩২৮ সালে সুলতান গিয়াসউদ্দীন তুগলকের আমলে বাংলাদেশ দিল্লি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। এটাও বেশিদিন টিকল না। ১৩৫২ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহের পরিচালনায়। ১৫৭৬ সালে বাংলার শেষ স্বাধীন পাঠান সুলতান দাউদ খাঁন কররানীর পতন পর্যন্ত গৌড়ের দরবারে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের কদর ছিল প্রভূত। সেই সময়ে স্থানীয় জনগণের সাথে শাহী দরবারের লোকজনদের ওঠা-বসা, লেন-দেন, ভাবের আদান-প্রদান চলতে থাকে। সে-কারণেই মনে হয়, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে কয়েকটি আরবি-ফারসি শব্দের অনুপ্রবেশ। বাংলার স্বাধীনতার যুগে গৌড়ের সুলতানগণ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা বহুলভাবে করতে থাকেন। সুলতান গিয়াসউদ্দীন আযম শাহের রাজত্বকালে (১৩৮৯-১৪০৯) পারস্যের কবি হাফিজকে (১৩২০-৮৯) বাংলায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। মিথিলার কবি বিদ্যাপতি (আনু ১৩৮০-১৪৬০) ও বাংলার কবি শাহ্ মুহম্মদ সগীরও সুলতান কর্তৃক অনুগৃহীত হয়েছিলেন। স্বাধীন বাংলার প্রথম শতাব্দীর শেষ আটাশ বছর (১৪১৪-১৪৪২) বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে শাহী দরবারে বাংলা ভাষা ও সাহিতা স্বীকৃতি লাভ করে। সংস্কৃতে রচিত ধর্মকথা বাংলা ভাষায় লেখার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেন বাঙালি কবি কৃত্তিবাস। ব্রাহ্মণ্যবাদের ধ্বজাধারীদের ফতোয়া ‘রৌরবং নরকং ব্রজেৎ’ অগ্রাহ্য করে কৃত্তিবাস বাল্মীকির রামায়ণকে বাংলা ভাষায় রূপান্তরিত করেন এবং গৌড়ের সুলতানের সম্মান অর্জন করেন। কৃত্তিবাস প্রকৃতই সেই যুগে ‘বিদ্রোহী’ ছিলেন।
Downloads
Downloads
Published
Issue
Section
License
Copyright (c) 2024 সাহিত্য পত্রিকা

This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivatives 4.0 International License.