আহমদ শরীফ : জীবন কথা
Abstract
প্রাজ্ঞতা ও পাণ্ডিত্যের যে মহিমা ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হকের মতো বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের দুই মহাপণ্ডিতকে ঘিরে থাকত তা আমরা অনুভব করি ডক্টর আহমদ শরীফের মধ্যেও। তিনি বাংলা সাহিত্যের খ্যাতনামা পণ্ডিত। তাঁর মৃত্যুতে বড় মাপের পণ্ডিত ও গবেষকদের জমানা প্রায় শেষ হল বলে মনে করি। বাংলাদেশের জ্ঞান বিদ্যার জগতে তিনি এক বিরাট মহীরুহ, এক অনন্যসাধারণ শিক্ষক ও অনুপম ব্যক্তিত্ব। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি ডক্টর শরীফের গবেষণা ও পাণ্ডিত্যের প্রধান এলাকা হলেও তিনি ইতিহাস, দর্শন, সমাজবিজ্ঞান, পুরাতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, রাজনীতি, শিক্ষানীতি ইত্যাদি মানববিদ্যার বিচিত্র শৃঙ্খলা সম্বন্ধে ছিলেন অনুসন্ধিৎসু এবং এসব বিষয়ে তিনি লিখেছেন একাধিক আলোচনা-সমালোচনা ও প্রবন্ধ এবং সেগুলোর কোনো কোনোটি গভীর দার্শনিক তত্ত্বসমৃদ্ধ, কোনো কোনোটি ঐতিহাসিক বিশ্লেষণঋদ্ধ। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনার কৃতিত্ব একমাত্র তাঁরই। যোগ্য সম্পাদনা করে ধূসর বিবর্ণপ্রায় বাংলা পুথিগুলোকে জীবন্ত রূপ দান এবং সেগুলোকে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের ধারায় বিশ্লেষণ ও বিন্যস্ত করা তাঁর অতুলনীয় কীর্তি। তবে শুধু ইতিহাসের অতীতে নয়, প্রতিদিনের চলমান জীবন সম্বন্ধেও ডক্টর শরীফ ছিলেন দারুণ কৌতূহলী। তিনি পর্যবেক্ষণ করতেন মানুষের হালচাল, জীবনযাত্রা, আর্থিক অবস্থা, রাজনীতির ছবি, সাংস্কৃতিক কর্মতৎপরতা, এবং এমন আরো কত প্রসঙ্গ ও অনুষঙ্গ এবং এ-সব সম্বন্ধে লিখতেন তাঁর ক্ষুদ্র নিবন্ধে কিংবা হালকা চালের প্রবন্ধে। বলাবাহুল্য, আমাদের চিন্তার জগতে ডক্টর আহমদ শরীফের বেশ বড় প্রভাব রয়েছে।বাংলাদেশের বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের তিনিও এক সেনাপতি। তাঁর বুদ্ধিবৃত্তি চর্চার কেন্দ্রীয় প্রণোদনা মানবমঙ্গল। সেজন্য সামাজিক অন্যায়, শোষণ ও পীড়নের বিরুদ্ধে তাঁর কলম সবসময় শাণিত, সবসময় তীক্ষ্ণমুখ এবং বেজায় সাহসী। যুক্তিহীন, পশ্চাৎপদ, রক্ষণশীল, অন্ধ প্রথাবদ্ধ ধ্যানধারণার তিনি ঘোর বিরোধী। তিনি বলেন, মানুষের দুই পা, দুই হাত, দুই চোখ সামনের দিকে, সুতরাং অগ্রযাত্রাই মানুষের জন্য স্বাভাবিক। প্রতিদিন সূর্যও একভাবে ওঠে না। পুরোনো নিয়ে থাকলে মানুষ এগুবে কী করে। মানুষ বিকাশশীল প্রাণী, বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে মানুষের পুরোনো ধ্যানধারণা ও বিশ্বাসের দুর্গ ভেঙে যাবে এবং এইভাবে মানুষ সভ্যতার পথে এগিয়ে যাবে। ভূতে-ভগবানে ও শাস্ত্রে ডক্টর শরীফের সম্পূর্ণ অনাস্থা, আর যুক্তি দর্শন ও বিজ্ঞানে তাঁর পূর্ণ আস্থা। নাস্তিক্যদর্শন জগৎসংসারে নতুন কোনো প্রসঙ্গ নয় । তিনি এ দর্শনে স্বস্তি পেতেন এই জন্য যে তা সর্বমানবিক, অসাম্প্রদায়িক এবং সম্পূর্ণরূপে অসূয়ামুক্ত। মানুষের ঈশ্বরে তাঁর আপত্তি নেই, কিন্তু ধর্মের ঈশ্বরে তিনি প্রত্যয় পাননি। যতই দিন গিয়েছে, ততই যুক্তি ও বিজ্ঞান তাঁকে টেনেছে এবং তাঁর জ্ঞান বুদ্ধিকে পাকাপোক্ত করেছে। সন্দেহ নেই, ডক্টর আহমদ শরীফ তাঁর মননঋদ্ধ রচনার মাধ্যমে আমাদের ভাবচিন্তার জগতে বিপুল আলোড়ন তুলেছেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের অভিভাবকতুল্য চিন্তাবিদ ও বুদ্ধিজীবী।
Downloads
Downloads
Published
Issue
Section
License
Copyright (c) 2024 সাহিত্য পত্রিকা - Shahitto Potrika | University of Dhaka

This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivatives 4.0 International License.