আহমদ শরীফের বিদ্যাচর্চার প্রধান ভুবন
Abstract
জীবন রচনা করতে হয়, আর বিদ্যা অর্জন করতে হয়। বিদ্যার্জনে বিদ্যানুরাগ আবশ্যিক শর্ত জগৎ সংসারে বিদ্যাপথযাত্রীর সংখ্যা খুব কম। বেশির ভাগ মানুষ জীবনের সুখস্বাচ্ছন্দ্যকামনায় ও বিত্তবাসনায় মশগুল থাকে। তবু সংস্কৃতিবান ও রুচিশীল মানুষ, বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যামোদী ও শিক্ষাদাতারা আছেন বলে বিদ্যাচর্চা অব্যাহত থাকে। প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যালাভের জন্য স্কুল-কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয় আছে। ঐসব কেন্দ্রে মেধাবী ছাত্রও জন্ম নেয়। কিন্তু মেধার কর্ষণ না হলে মেধা মরে যায়। সেজন্য দেখা যাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে খুব ভাল পাশ, কিন্তু পরবর্তী জীবনে বিদ্যার সঙ্গে সংযোগবিচ্ছিন্ন। এসব তথাকথিত মেধাবী জ্ঞানরাজ্যে কোন অবদান রাখতে পারে না। জ্ঞানার্জন নিরবচ্ছিন্ন সাধনার ব্যাপার। ধ্যানীর মতো সাধনা না করলে কোন সিদ্ধি লাভ করা যায় না। অবশ্য শিক্ষিত বাঙালির বিদ্যানুরাগ সুবিদিত এবং এ-অনুরাগের ঐতিহ্যও বহুদিনের। মধ্যযুগ থেকেই শিক্ষিত বাঙালি বিদ্যাচর্চা করে আসছে। তখন ছিল ধর্মের যুগ। দেশজ ধর্মের সঙ্গে বহিরাগত ধর্মের সংঘাত ও সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল নতুন চিন্তা, নতুন সংস্কৃতি ও নতুন ভাবধারা । এরই অভিপ্রকাশ ঘটল নানা ধর্ম সম্প্রদায়ের চিন্তাচেতনায় ও সাহিত্যসাধনায়। মধ্যযুগে বৃহত্বঙ্গে গৌড়, নবদ্বীপ, মিথিলা, রোসাঙ্গ, ত্রিপুরা, চট্টগ্রাম, কৃষ্ণনগর ইত্যাদি ছিল বিদ্যাকেন্দ্র। শিক্ষার্থীরা পণ্ডিতেরা, সাধকেরা এবং কবিযশপ্রার্থীরা এসব জায়গায় ভিড় করতেন। রাজানুকূল্য ও পৃষ্ঠপোষকতা ছিল অকুণ্ঠিত। দরবারি সংস্কৃতিতে যোগ্য লোকের কদর সবসময় হয়েছে, দৃষ্টান্ত আলাউল ও ভারতচন্দ্র। এঁরা ছিলেন উৎকৃষ্ট কলাবিদ ও বিদ্বান। মধ্যযুগে বিদ্যাবত্তার প্রকাশ ঘটেছে কাব্যাঙ্গিকে; প্রধানত উপাখ্যান রচনায়, শাস্ত্রকথায়, ধর্মপুরুষের দিব্য চরিতাখ্যানে, তত্ত্বমূলক গীতভাষ্যে, কিংবা স্মৃতি ও ন্যায়শাস্ত্র ব্যাখ্যায়। নদীয়ার বৈষ্ণব শাস্ত্রীরা বিদ্বান বলে পরিচিত ছিলেন; তেমনি ছিলেন সুফি ও মরমী কবিরা। বাংলার অধ্যাত্ম সাধনার মননগত পরিচর্যা আছে। এর গূঢ় তত্ত্বগুলো নানা ভাব চিন্তা কর্ম ও চেতনার অভিব্যক্তি। বিশ্লেষণ, বিচার, তর্কপ্রতর্ক, সিদ্ধান্ত ও মীমাংসাগুলো ছিল সূক্ষ্ম, প্রগাঢ় ও ভাবোদ্রেককারী। এগুলো গভীর অধ্যয়নেরও প্রকাশক। ভাববাদী মধ্যযুগের সাধনায় বিদ্যাবত্তার যে পরিচয় পাওয়া যায় তার মধ্যে মাঝে মাঝে গুরুতর সমাজজিজ্ঞাসার সন্ধানও যে পাওয়া যায় না এমন নয়। সেসময়ও রাষ্ট্রচিন্তা, সমাজভাবনা, রাজনীতিজ্ঞান, অর্থশাস্ত্র, বাণিজ্যবিদ্যা, সংস্কৃতিচর্চা সবই ছিল; কিন্তু একালের মতো এই সব আধুনিক বিদ্যার এলাকা প্রভূতভাবে কর্ষিত হওয়ার ক্ষেত্র তৈরি হয় নি। সেকালে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও যন্ত্রকৌশলের উদ্ভাবন না ঘটায় মানুষের ধ্যানধারণায় ছিল স্থবিরতা, গতানুগতিকতা ও বদ্ধতা। বিদ্যাচর্চার প্রধান এলাকা ছিল ধর্ম ও দর্শন। ভূয়োদর্শনও একপ্রকার দর্শন বটে। যেহেতু তা জগৎ সংসারের নিয়ম ও মানবিক আচরণের কিছু চিরন্তন সত্যের উপলব্ধি। সন্দেহ নেই, ভূয়োদর্শন অভিজ্ঞতা নির্ভর এবং তা লোকাচারে ও লোকসাহিত্যে স্থান করে নিয়েছে। বিজ্ঞানবোধ ছিল না বলে মধ্যযুগের বাঙালি একদিকে অবারিত কল্পনাবিলাসী হয়েছে এবং পরীর কেসসা ও অবিশ্বাস্য দুঃসাহসিক অভিযানপূর্ণ প্রণয়কাহিনী বা যুদ্ধকথা রচনা করেছে ; অন্যদিকে ধর্মের অলৌকিকতায় ও দিব্য ভাবনায় বাঁধা পড়ে সৃষ্টি করেছে নানা শাস্ত্র, দর্শন ও জ্ঞান। এসব জ্ঞানই প্রধানভাবে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে ব্যক্ত হয়েছে। বলাবাহুল্য, দীর্ঘ পাঁচশ বছর মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য রচিত হয়েছে এবং সমৃদ্ধি অর্জন করেছে।
Downloads
Downloads
Published
Issue
Section
License
Copyright (c) 2024 সাহিত্য পত্রিকা - Shahitto Potrika | University of Dhaka

This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivatives 4.0 International License.