মোহাম্মদ বরকতুল্লাহর দর্শনচিন্তা
Abstract
পারস্য প্রতিভা গ্রন্থের জন্য খ্যাত মোহম্মদ বরকতুল্লাহ (১৮৯৮-১৯৭৪) বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে দর্শনচর্চায় অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর মানুষের ধর্ম (১৯৩৩) গ্রন্থটি দর্শনভাবনায় সমৃদ্ধ। এ বইয়ের প্রকাশকালে তাঁর বয়স যদিও পঁয়ত্রিশ বছর, কিন্তু এর কিছু প্রবন্ধ পত্রিকায় ছাপা হয় তাঁর ছাত্রজীবনেই, যখন তিনি বাইশ/ তেইশ বছরের যুবকমাত্র। পারস্য প্রতিভা' গ্রন্থেরও কিছু প্রবন্ধত দর্শনচিন্তায় ঋদ্ধ এবং যা তাঁর একান্ত তরুণ বয়সের রচনা। আমরা জানি, মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে দর্শনের ছাত্র ছিলেন। তবে এটাই তাঁর দর্শনচর্চার একমাত্র ব্যাখ্যা নয়। বরং এই বিশ্বজগৎ, তার সৃষ্টিবৈচিত্র্য ও জীবনরহস্যকে লেখক দার্শনিকের অনুসন্ধিৎসা নিয়ে অনুধাবন করতে চেয়েছেন, এটাই তাঁর দর্শনচিন্তার মূল বিষয়। পরিণামে তিনি কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন তা ভিন্নভাবে বিবেচ্য। তবে বাঙালি শিক্ষিত মুসলিম সমাজ যখন কেবল উন্মেষ পর্যায়ে, সমাজের শিক্ষিত অংশটি পরিমাণগত বিবেচনায় একেবারেই ক্ষুদ্র, গোটা সমাজের ওপর যখন অশিক্ষা কুশিক্ষা, কুসংস্কার, পশ্চাৎপদতা, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কূপমণ্ডূকতার ঘন গভীর আচ্ছাদন তখন তার অশুভ বন্ধন থেকে বেরিয়ে এসে ভারতীয়, আরবীয়, পারস্য ও পাশ্চাত্য দর্শনের আলোকে নিজ চিন্তা ও জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করার এই প্রয়াস অবশ্যই প্ৰশংসনীয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, জীবন ও জগৎ ব্যাখ্যায় দার্শনিকের অনুসন্ধিৎসার বিষয়টি স্বতন্ত্রভাবে অনুধাবনীয়। দার্শনিকের সঙ্গে ধর্মবেত্তার একটি মৌলিক পার্থক্য হলো, দার্শনিক যুক্তির পথ অনুসরণ করেন আর ধর্মবেত্তা বেছে নেন একান্ত বিশ্বাসের পথ। অন্যদিকে যুক্তিশীলতা উভয়ের মৌলধর্ম হওয়া সত্ত্বেও বিজ্ঞানীর সঙ্গেও দার্শনিকের রয়েছে পার্থক্য। বিজ্ঞানীর আরাধ্য যেখানে প্রত্যক্ষ জ্ঞান, বস্তুনির্ভর গবেষণা; দার্শনিকের অনুধ্যান সেখানে বস্তুকে অতিক্রম করে বিশ্বপ্রকৃতি ও মানবপ্রজাতির চেতনপ্রক্রিয়ার নানা বৈশিষ্ট্যকে আশ্রয় করে অগ্রসরমান। উভয়ের আরাধনার বৈশিষ্ট্য যেমন ভিন্ন তেমনি বক্তব্য প্রকাশের ভাষাও স্বতন্ত্র। বিশ্বজগৎ, তার সৃষ্টিরহস্য, প্রকৃতিলোক ও মানবমনের সূক্ষ্ম ও নিগূঢ় বৈশিষ্ট্যসমূহকে অনুধাবনের জন্য দার্শনিককে একাগ্র ধ্যানে নিয়োজিত থাকতে হয়। এই ধ্যান ধর্মচর্চাকারীর ঈশ্বর-আরাধনা থেকে যেমন ভিন্ন তেমনি বিজ্ঞানীর গবেষণাগারের সাধনা থেকেও পৃথক। দার্শনিককে ধর্মবেত্তা ও বিজ্ঞানী উভয়ের থেকে সূক্ষ্ম স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে সৃষ্টি-উৎস, প্রাকৃতিক নিয়ম, মানবের দেহ-মনের সম্পর্ক, মানুষের শুভ-অশুভ, মহৎ-অমহৎ বোধ সংক্রান্ত নানা জিজ্ঞাসার যুক্তিগ্রাহ্য উত্তর খুঁজতে হয়। মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ দার্শনিক, বিজ্ঞানী ও ধর্মবেত্তার এই সূক্ষ্ম পার্থক্য সম্পর্কে কতটা সচেতন থেকে দর্শনচর্চা করেছেন, তাঁর দর্শনচিন্তার বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণের পাশাপাশি সেটা বিবেচনা করাও এ প্রবন্ধের লক্ষ্য।
Downloads
Downloads
Published
Issue
Section
License
Copyright (c) 2001 সাহিত্য পত্রিকা

This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivatives 4.0 International License.