পরশুরাম ও তাঁর ‘গড্ডলিকা’
Abstract
ছোটগাল্পিক, ভাষাবিজ্ঞানী, অভিধান-সংকলক, অনুবাদক, রসায়নবিদ, শিল্প-ব্যবস্থাপক ইত্যাদি বিশেষণে বিভূষিত হলেও, কৌতুক রসস্রষ্টা হিসেবেই বাংলা সাহিত্যে রাজশেখর বসু ওরফে পরশুরাম (১৮৮০-১৯৬০) সমধিক পরিচিত। রঙ্গ-ব্যঙ্গ-কৌতুককে যাঁরা শিল্পের মর্যাদায় উন্নীত করেছেন, পরশুরাম তাঁদের অন্যতম। তাঁর অনেক রচনাই বাংলা সাহিত্যে ক্লাসিকের মর্যাদায় অভিষিক্ত। দেশ ও সমাজের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও মানবকল্যাণ আকাঙ্ক্ষা তাঁকে সাহিত্যিক রূপে আবির্ভাবের প্রেরণা যুগিয়েছে। রঙ্গ-ব্যঙ্গ-কৌতুকের মাধ্যমে তিনি সামাজিক ভণ্ডামি, সাংসারিক অসঙ্গতি ও ব্যক্তিক স্খলন তুলে ধরেছেন, কামনা করেছেন এইসব বিপন্নতা থেকে মানুষের আকাঙ্ক্ষিত মুক্তি। এ কারণেই বহুমাত্রিক অসঙ্গতি ও ব্যঙ্গের স্রষ্টা হলেও তাঁর বড় পরিচয় তিনি জীবনরসিক কথাকার, মনুষ্যত্বের রূপকার, নিরাসক্ত দৃষ্টিসম্পন্ন বিজ্ঞানমনস্ক শব্দশিল্পী। তাঁর আবির্ভাবের পূর্ববর্তী বাংলা সাহিত্যে প্রচলিত শ্লেষ ও রঙ্গ-ব্যঙ্গের ধারাকে তিনি সম্পূর্ণ পাল্টে দিলেন। আত্মসমালোচনা ও অন্যকে আক্রমণ করার প্রবণতার পরিবর্তে বাংলা হাস্যরস-প্রধান সাহিত্যের ধারায় তিনি নিয়ে এলেন নতুন মাত্রা। পরশুরামের হাস্যরসমূলক সাহিত্যভুবন উদারতায় প্রসন্ন, বুদ্ধির দীপ্তিতে শাণিত, প্রগতিশীল সমাজচেতনায় সমৃদ্ধ এবং মনুষ্যত্ববোধে সমুজ্জ্বল। পরশুরামের এসব সাহিত্যবৈশিষ্ট্য তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা গড্ডলিকা-তে (১৯২৫) বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তবে পরশুরামের গড্ডলিকা-তে অনুপ্রবেশের পূর্বে তাঁর জীবনগঠন, মানসবৈশিষ্ট্য ও সাহিত্যপ্রবণতা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা এখানে আবশ্যক বলে বিবেচনা করি ১৮৮০ সালের ১৬ই মার্চ, মঙ্গলবার), বর্ধমান জেলার শক্তিগড়ের কাছে বামনপাড়ায় মাতুলালয়ে রাজশেখর বসু জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম চন্দ্রশেখর বসু, আর মাতা লক্ষ্মীমণি দেবী। সরকারি কর্মচারি হিসেবে চন্দ্রশেখর ডাকবিভাগ, জেলা কালেক্টরি, ইন্ডিগো কমিশন প্রভৃতি সংস্থায় চাকুরি করেন। অধ্যাত্মসাধক হিসেবেও সমকালে তিনি বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন। ধর্মবিষয়ক গ্রন্থের লেখক রূপেও চন্দ্রশেখর খ্যাতি লাভ করেন। পিতার চারিত্র্যবৈশিষ্ট্য রাজশেখর বসুকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে । উত্তরকালে পিতার মতো তিনিও বাঙালি বিদ্বৎসমাজে অর্জন করেন সমধিক পরিচিতি। রাজশেখর বসুর ডাকনাম ফটিক। গড্ডলিকা প্রকাশের পর রাজশেখর বসু বা ফটিক নামকে ছাপিয়ে তিনি 'পরশুরাম' নামেই খ্যাতির শীর্ষে উপনীত হন। তবে 'পরশুরাম' নাম গ্রহণের কোন পূর্ব-পরিকল্পনা তাঁর ছিল না। অকস্মাৎই ছদ্মনাম হিসেবে পরশুরাম নামটি তিনি গ্রহণ করেন। ‘উৎকেন্দ্র' নামের এক সাহিত্য সংস্থার রবিবাসরীয় বৈঠকে 'সিদ্ধেশ্বরী লিমিটেড' নামে তিনি একটি গল্প পাঠ করেন। গল্পটি শুনে রায় বাহাদুর জলধর সেন তা প্রকাশের জন্য ভারতবর্ষ পত্রিকায় প্রেরণ করতে আগ্রহী হন। কিন্তু রাজশেখর বসুর তাতে সায় ছিল না। তিনি স্বনামে তা প্রকাশ করতে দ্বিধান্বিত ছিলেন। অগত্যা সামনে উপস্থিত 'পরশুরাম' নামে মিষ্টির দোকানের এক কর্মচারির নামই রাজশেখর বসু ছদ্মনাম হিসেবে গ্রহণ করলেন। যেভাবেই গৃহীত হোক না কেন, পরিণতিতে এই নামটি রাজশেখর বসুর জীবনকেই যেন সার্থক করে তুলেছিল।
Downloads
Downloads
Published
Issue
Section
License
Copyright (c) 2002 সাহিত্য পত্রিকা - Shahitto Potrika | University of Dhaka

This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivatives 4.0 International License.