প্রমথ চৌধুরীর ‘আহুতি' গল্পগ্রন্থের বিষয়স্বাতন্ত্র্য
Abstract
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরে বাংলা ছোটগল্পের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য একটি নাম প্রমথ চৌধুরী (১৮৬৮-১৯৪৬)। রবীন্দ্র-যুগে জন্মগ্রহণ করেও তিনি ছিলেন স্বাতন্ত্রে সমুজ্জ্বল। রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্রের গল্পের সঙ্গে তাঁর গল্পের কোন মিল নেই। কেননা, তাঁর গল্পের গোত্র আলাদা। তাঁর গল্পের বিষয়বস্তু— প্রেম ও রোমান্টিক প্রেমের ন্যাকামি, মর্যালিটি ও চারিত্রিক বিশুদ্ধতা, রাজনীতি ও সুবিধাবাদ, অ্যাডভেঞ্চার, ভূত আর রোমান্স। বিশুদ্ধ গল্পরস সৃষ্টিই তাঁর সাহিত্যের মুখ্য বিষয়— সামাজিক বা নৈতিক আদর্শ শিক্ষা দেয়া নয়। সাহিত্য প্রতিভায় তিনি ছিলেন অনন্যসাধারণ। প্রমথ চৌধুরীর জন্ম যশোরে। বড় হয়েছেন তৎকালীন রাজসিক আভিজাত্যের লীলাভূমি কৃষ্ণনগরে। ছেলেবেলায় তিনি 'নানা জাতের নিম্নবর্ণের মানুষ' আর ‘আধা-ভদ্রলোকদের' সংস্পর্শে এসে শিখতে পেরেছিলেন ভিন্নধর্মী মানুষের ভিন্ন ভিন্ন ভাষা। উদার ও সংস্কারমুক্ত মানুষ ছিলেন বলেই তাঁর মধ্যে ধর্মের গোঁড়ামী ছিলো না, সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা ছিলো না। বাবার সংগৃহীত বিশাল গ্রন্থভাণ্ডারের আনুকূল্যে ছেলেবেলা থেকেই তিনি পরিচিত হয়েছেন দেশ- বিদেশের ইতিহাস, স্কটের উপন্যাস, শেক্সপিয়র-মিল্টন-বায়রনের রচনার সঙ্গে। ছাত্র হিসেবেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। বি. এ. ও এম. এ. পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে তিনি ব্যারিস্টারি পড়তে রওনা হন বিলেতে। ব্যারিস্টার হয়ে দেশে ফিরেও আইন ব্যবসায় তাঁর মন বসলো না। কলকাতার শৌখিন বড়লোকদের বড়মানুষী চালচলন দেখে বেড়াতে তাঁর ভাল লাগলো : 'রাজা মহারাজাদের সঙ্গলাভ, গার্ডেন পার্টিতে যাতায়াত, ব্র্যাণ্ডি আর শ্যাম্পেনের অভ্যাস চললো কিছুদিন। উঁচু সমাজের বিলাসী আবহাওয়ায় দিন কাটতে লাগলো বটে, তবুও প্রমথ চৌধুরীর চোখ দেখতে ভুল করল না লক্ষ্ণৌয়ের মনোহারিণী বাইজিকে, দার্জিলিঙ-এ সাক্ষাৎ পাওয়া সুন্দরী ফিঞ্চকে; মন গ্রহণ করতে ভুল করল না সিমলার কাঞ্চী নামীয় গাইয়েদের।” এভাবে ক্রমেই তিনি একজন মজলিশি মানুষ হয়ে উঠলেন- গড়ে উঠল তাঁর 'কমলালয়ে' সাহিত্য-মজলিশ। সেখানে সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান, ভাষাতত্ত্ব, সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি, ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব ইত্যাদি সব কিছুরই আলোচনা হতো। আর আলোচনার লক্ষ্য ছিল মনকে আনন্দ দেয়া- মনকে ভারাক্রান্ত করা নয় এবং সবকিছু বুদ্ধি দিয়ে বিচার করে গ্রাহ্য করা। সেসব আলোচনার ধরনটা হালকা হলেও বিষয় মোটেও হালকা ছিল না। এভাবেই ভাব, চিন্তা ও সাহিত্যের সমন্বয়ে অসাধারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন প্রমথ চৌধুরীর মানসজগৎ গড়ে উঠেছিল। প্রমথ চৌধুরীর এই আভিজাত্যপূর্ণ জীবনবোধের কারণে তাঁর ছোটগল্প বাঙালি মধ্যবিত্তের সচেতন হৃদয়চর্চা থেকে নতুন প্রান্তরে সরে এসেছে। তাই তাঁর গল্পের উপকরণে ও রচনারীতিতে এসেছে বৈচিত্র্য। তাঁর বিষয়বোধ, মননধর্ম ও বিশিষ্ট রচনারীতির কারণে প্রবন্ধ ও কবিতার পাশাপাশি তিনি ছোটগল্প রচনার ক্ষেত্রেও হয়েছেন নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে জ্যোতির্ময়। তাঁর প্রতিভা ছিল অনন্যসাধারণ, মেধাক্ষুরধার এবং দৃষ্টি সুদূরপ্রসারী। তাই তাঁর লেখনী অনায়াসে বিচরণ করেছে সমাজের সর্বত্র গল্পের পরিধি বিস্তৃত হয়েছে মধ্যবিত্ত জীবন থেকে অভিজাত সমাজের শীর্ষ পর্যন্ত। গল্পে প্রাধান্য পেয়েছে, ধর্ম-সংস্কারমুক্ত উদার জীবনবোধ আর নীতি-শাসনমুক্ত বেপরোয়া যৌবনের স্বীকৃতি।
Downloads
Downloads
Published
Issue
Section
License
Copyright (c) 2003 সাহিত্য পত্রিকা

This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivatives 4.0 International License.