বুদ্ধদেব বসুর 'কঙ্কাবতী': প্রেম ও প্রকরণ

DOI: https://doi.org/10.62328/sp.v47i3.1
Crossmark

Authors

Abstract

ত্রিশোত্তর কবিদের অন্যতম কবিপ্রতিভা বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৪) জীবনচৈতন্যের রসাস্বাদন ভিন্নতায়, দার্শনিক প্রজ্ঞাপ্রসূত অনুধ্যান ও পরিশীলিত পরীক্ষা-নিরীক্ষায় রবীন্দ্রোত্তর কাব্যে স্বাতন্ত্র্যসূচক অভিধায় চিহ্নিত। প্রবল রবিদ্রোহিতায় তাঁর কাব্যারম্ভ ঘটলেও পরিণতিতে তিনি রাবীন্দ্রিক রোমান্টিক জগতেই প্রত্যাবর্তিত ফরাসি প্রতীকবাদী কাব্যান্দোলনের পথিকৃৎ বোদলেয়ারীয় চেতনায় প্লাবিত হয়েও বিশ্বকবিতার আলোবাতাস বিশেষ করে প্রি-র্যাফায়েলাইট কবিদের ভাব-বিহ্বলতায় বুদ্ধদেবের মানস-ভূমণ কবির রোমান্টিক চিত্তেরই লক্ষণ পরিস্ফুট। যুগযন্ত্রণা, লিবিডোর অন্তর্চাপ, অস্তিত্বের প্রগাঢ় সঙ্কট, সর্বোপরি, যৌবনচেতনায় ভয়ানক নৈঃসঙ্গ্যবোধে কবি অন্তর্হিত হয়েছেন প্রি-র‍্যাফায়েলাইট কবি রসেটি-মরিস প্রভৃতির কাছে; তেমনি অবগাহন করেছেন প্রাচীন লোকপুরাণ ও ঐতিহ্যগাথা রূপকথার জগতে। দীপ্তি ত্রিপাঠী কঙ্কাবতীকে প্রাচ্য-পাশ্চাত্য সৌন্দর্যপ্রেরণার নির্বস্তুক আধার হিসেবে গ্রহণ করে ‘কঙ্কাবতী হ'ল এই তিলোত্তমা' বলে অভিহিত করলেও আসলে বুদ্ধদেবের কঙ্কাবতী কেবলি ভাবকল্পলোকের সৌন্দর্যলক্ষ্মী নয়; নিশ্চিত আধুনিকতার মন্ত্রজালে উদ্বুদ্ধ হয়েই লোকনায়িকা কঙ্কাবতী-র শতাব্দী-প্রাচীন শায়িত ও ঘুমন্ত শবতুল্য শরীরের মধ্যে বুদ্ধদেব এনেছেন মানবিক রক্ত মাংসের ইন্দ্রিয়-প্রত্যক্ষ বিশশতকীয় রূপবৈচিত্র্য। অর্থাৎ ভারতীয় দেহ-অস্বীকৃত মৃতপ্রায় ও প্রাচীন প্রেম ধারণার আর্কেটাইপকে কবি সম্পূর্ণত বিদেশী ভাব-কল্পনায় সংশ্লেষিত করে তৈরি করেছেন নতুন কঙ্কাবতীকে। পাশাপাশি ভাঙতে চেয়েছেন প্রাচ্য প্রেমবোধের রোমান্টিক ঊর্ধ্বচারী শরীরহীন প্রেমের ঐতিহ্যকে। এ কঙ্কা মূলত প্রাচ্য লোক-নায়িকার আদলে পাশ্চাত্য নায়িকার নতুন সংস্করণ। এ- কালের কঙ্কা আজানুলম্বিত কালো কেশবিন্যাসের বদলে লালচে হালকা চুলের ইন্দ্রিয়- প্রত্যক্ষের দেহী বাসনায় উন্মুখ। এ-কারণেই ‘সেরেনাদ' ‘আরশী' প্রভৃতি কবিতায় ঘুমমগ্না কঙ্কার সুপ্তিকে ভেঙে দিতে চান কবি- 'কঙ্কা জাগো'...এ আহ্বানে। আর কঙ্কাবতী (১৯৩৭)কাব্যটি বাংলা কবিতায় নতুন চিন্তার সূচক। তদুপরি এ-কাব্যে বুদ্ধদেব সুস্থ যৌবনের আবগ-উচ্ছ্বাসে যেমন দেহী-বাসনায় তাঁর প্রেমিকার রূপ- সৌন্দর্যকে নির্মাণ করেছেন, তেমনি, দেহকে অবলম্বন করেই পার হতে চেয়েছেন দেহের সীমানা। দেহ ও মনের অপূর্ব সমন্বয়ে প্রেমের সোপান তিনি নির্মাণ করতে চেয়েছেন। মানসিক দোলাচল, দিধা সংশয়, হার্দিক অস্থিরতা তাঁর কাব্যের নায়ক- নায়িকাকে একটি সুস্থিত প্রেম-অন্বেষী মানবিক সুস্থতা প্রদান করেছে কঙ্কাবতী কাব্যের কবিতাগুলো বুদ্ধদেবের এই পরিবর্তনটুকরও স্বাক্ষর বহন করে বস্তুত ত্রিশের কবিদের প্রধান অন্বিষ্ট প্রেম : প্রেমের বহুবর্ণিল সিংহদ্বার অতিক্রমণের সূত্রেই জীবন-সম্পর্কিত সুনির্দিষ্ট মীমাংসায় এ-সময়ের কবিদের উত্তরণ : রাবীন্দ্রিক রোমান্টিক ভাববিহ্বল অন্তর্জগৎ থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে তাঁদের প্রেম হয়ে উঠলো দেহজ কাম-প্রতপ্ত, ক্লেদ-গ্লানি, হতাশা ও নৈরাশ্যে নিমজ্জিত । বস্তুত মর্তকেন্দ্রিক প্রেমের ইন্দ্রিয়-ঘনত্ব সৃষ্টিতে কবিদের প্রেমিকা হয়ে উঠল মৌহূর্তিক, ফ্রয়েতিয় লিবিডো-তাড়িত মানসিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ভাববহ। যৌবন ও প্রেম বুদ্ধদেব বসুর কবিতার মূল উৎস হলেও প্রেমের বস্তু-ঘনত্বে, প্রাত্যহিক রূপ-নির্মিতিতে ও শরীরী সান্নিধ্যের উষ্ণ- প্রগাঢ়তায় তাঁর প্রেম রাবীন্দ্রিক বৃত্ত-অতিক্রমী। তাঁর প্রেম চেতনায় দ্বৈধ বৈশিষ্ট্য সংশ্লেষিত। একদিকে ফ্রয়েডিয় যৌনবিজ্ঞানের প্রভাবজাত আতপ্ত রিরংসাকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে দেহকে কেন্দ্র করেই কবির দেহাতীত প্রেমে উত্তীর্ণ হবার অদম্য স্পৃহা। ফলত তাঁর প্রেম দ্বিধা দ্বন্দ্ব সংশয়, সন্দেহ ও কূটাভাসে প্রোজ্জ্বল; সংঘাতময় ইতি- নেতির দোলাচলে দোলায়িত। 

উপরের যেকোনো বিকল্প বেছে নিন

Downloads

Downloads

Download data is not yet available.
cover

Published

2006-06-01

এই জার্নাল উদ্ধৃতির নিয়ম

বুদ্ধদেব বসুর ’কঙ্কাবতী’: প্রেম ও প্রকরণ. (2006). সাহিত্য পত্রিকা, 47(3), ০৭-২৩. https://doi.org/10.62328/sp.v47i3.1

একই বিষয়ের আরও নিবন্ধ

লোড হচ্ছে…

এই লেখকের অন্যান্য নিবন্ধ

লোড হচ্ছে…
এখন শুনছেন প্রবন্ধের শিরোনাম...
0%