‘আবেহায়াত' উপন্যাসে বাঙালি মুসলমান সমাজের ধর্মীয় ক্রমবিকাশ

DOI: https://doi.org/10.62328/sp.v48i1-2.10
Crossmark

Authors

Abstract

উপন্যাস আধুনিক যুগের সৃষ্টি। প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্যিক পরিমণ্ডলে উপন্যাসের সৃষ্টি সম্ভব ছিল না, কেননা তখন মানুষের মধ্যে স্বাতন্ত্র্যবোধের সৃষ্টি হয়নি। কালের বিবর্তনে ধর্মের বেড়াজাল ছিন্ন করে যখনই মানুষ নিজেকে একটা স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবে আবিষ্কার করল এবং শিক্ষাদীক্ষায়, জ্ঞানে-বিজ্ঞানে ও সর্বোপরি মানবতাবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে আত্মনির্ভরশীল ও মুক্তমনের অধিকারী হতে শুরু করল, মূলত তখন থেকে আধুনিকতার দিকে আমাদের যাত্রা শুরু। “ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের উদ্বোধন উপন্যাস-সাহিত্যের একটি অপরিহার্য শর্ত। মধ্যযুগের মানুষ কতগুলি সুনির্দিষ্ট সামাজিক বিন্যাসের মধ্যে আবদ্ধ ছিল । সেখানে তার ব্যক্তিত্ব বিকাশের পথ ছিল রুদ্ধ। মধ্যযুগীয় পরিমণ্ডল থেকে মানুষের মুক্তির চেতনাই আধুনিকতার সূচক।”১ উনিশ শতকীয় রেনেসাঁসের পথ পেরিয়ে বাঙালি মুসলমান সমাজে যে জাগরণ পরিলক্ষিত হয় তাতেও একটা বড়ো বাধা ছিল ধর্মীয় কূপমণ্ডূকতা। ধর্মীয় বিশ্বাসের আবরণে পীরপ্রথা বা পীরকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থা ও ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থার ধারা থেকে আধুনিক শিক্ষাপ্রণালীতে উত্তরণ ছিল বাঙালি মুসলমান সমাজের জাগরণের একটা বিশেষ দিক। বিশ শতকের প্রথমার্ধে রাজনৈতিক আন্দোলনের সমান্তরালে সামাজিক-সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এই বিশেষ দিকটির অন্যতম পুরোধা ছিলেন আবুল মনসুর আহমদ (১৮৯৮-১৯৭৯)। এ সময়ে মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলমান সমাজ পীরকেন্দ্রিক চিন্তাচেতনা ও পশ্চাৎপদ শিক্ষাব্যবস্থার মানসিকতা থেকে কীভাবে প্ৰগতিশীল মানসিকতায় রূপান্তরিত হচ্ছিল আবুল মনসুর আহমদের আবেহায়াত (১৯৬৮) উপন্যাসে সেই সামাজিক ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে। 

সাহিত্যজগতে আবুল মনসুর আহমদের খ্যাতি একজন ব্যঙ্গকার হিসেবে। সমাজ, ধর্ম, রাজনীতি ও অর্থনীতির নানান অসংগতির খণ্ডিত চিত্রকে তিনি ব্যঙ্গগল্পের বিষয়বস্তু হিসেবে নির্বাচন করেছেন, আর এসব বিষয়ের একটা পূর্ণাঙ্গ চিত্রায়ণ তাঁর উপন্যাসগুলো । ব্যক্তিজীবনে রাজনীতি ও সাংবাদিকতার মিশ্রণে যে বাস্তব অভিজ্ঞতা তিনি সঞ্চয় করেছেন তার প্রতিফলন দেখা যায় উপন্যাসে। তাঁর রচিত উপন্যাসের সংখ্যা তিন, যথা— জীবন- ক্ষুধা (১৯৫৫), সত্যমিথ্যা (১৯৫৩) ও আবেহায়াত (১৯৬৮)। সত্যমিথ্যা উপন্যাসটি লেখকের মৌলিক রচনা নয়, এটি জোহান বোয়ারের দি পাওয়ার অব এ লাই-এর বাংলা রূপান্তর।` আবুল মনসুর আহমদের তৃতীয় এবং শেষ উপন্যাস আবেহায়াত (১৯৬৮) গ্রন্থাকারে প্রকাশের আগে ঢাকার ‘মাসিক মোহাম্মদী' পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে মুদ্রিত হয়েছিল। “পূর্ব-বাংলার গ্রামীণ সমাজ-জীবনে পীরপ্রথা ও পীরদের প্রভাব-প্রতিপত্তি, গ্রামবাসীদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও ধর্মশিক্ষা এবং আধুনিক শিক্ষার দ্বন্দ্ব-সংঘাত অবলম্বনে  আবেহায়াত রচিত। আবেহায়াত শব্দের অর্থ fountain of life i হামিদের মাধ্যমে লেখক দেখিয়েছেন যে, কীভাবে একজন মানুষ ধর্মান্ধতা ও গোঁড়ামির পরিবেশ থেকে নিজেকে ক্রমান্বয়ে মুক্ত করে আধুনিক চিন্তা-চেতনার পথে পা বাড়ায়। সেই সঙ্গে ধর্মান্ধতা ও পীরালি ব্যবসায়ের পতনের একটা চিত্রও এখানে স্পষ্ট। “বর্ণনায় লেখকের তির্যক দৃষ্টিভঙ্গিই অধিক সক্রিয়, বস্তুতঃ সমাজ-চেতনার কিংবা বিদ্রূপের কশাঘাতে সামাজিক মানুষের সংশোধনের একটি প্রবল বাসনা এতে ধরা পড়ে। তাই এ উপন্যাসে তিনি সত্যের সন্ধানে অনেক ক্ষেত্রেই 'আয়না'র রূপকার রূপে পুনরাবির্ভূত হয়েছেন বললে অত্যুক্তি হবে না।”* বিশ শতকের মধ্যভাগের মুসলমান সমাজের ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার ও পীর-প্রথা থেকে মুক্তির উদগ্র আকাঙ্ক্ষাই আবেহায়াত উপন্যাসের মূল বিষয়।

Downloads

Downloads

Download data is not yet available.
cover

Published

2025-04-09

এই জার্নাল উদ্ধৃতির নিয়ম

‘আবেহায়াত’ উপন্যাসে বাঙালি মুসলমান সমাজের ধর্মীয় ক্রমবিকাশ . (2025). সাহিত্য পত্রিকা, 48(1-2), 167-187. https://doi.org/10.62328/sp.v48i1-2.10
এখন শুনছেন প্রবন্ধের শিরোনাম...
০%: ০/০