কথাসাহিত্যে চেতনাপ্রবাহরীতি : আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ছোটগল্প
Abstract
মানবচেতনাস্থিত বোধ বা চিন্তা-চেতনার অবসাদহীন, ক্লান্তিহীন প্রবহমান অস্তিত্বকে আধুনিক সাহিত্যিকেরা একটি রীতিতে ধারণ করতে চেয়েছেন যাকে তাঁরা Stream of Consciousness বা চেতন্যপ্রবাহরীতি নামে অভিহিত করেন। M.H. Abrams চেতনাপ্রবাহরীতিকে ব্যাখ্যা করে লিখেছেন : 'The Stream of consciousness... is a mode of narration that undertakes to capture the spectrum and flow of a characters mental process, in which sense perceptions mingle with conscious and half-conscious thoughts, memories, expectations, feelings and random associations". চেতনাপ্রবাহরীতিতে ধারণ করা হয় চরিত্রচিত্তের প্রবহমান অন্তর্বাস্তবতাকে, যেখানে চরিত্রটির প্রত্যক্ষণ এবং অনুভবের সঙ্গে একাকার হয়ে মিশে থাকে চেতন এবং অর্ধচেতনস্তরের চিন্তারাশি, স্মৃতি, অবদমিত আকাঙ্ক্ষা এবং অনুভূতি । বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী কথাসাহিত্যিকেরা মানবমনের প্রাকবাচনিক স্তরে প্রবহমান এই সতত পরিবর্তনশীল ভাবনারাশিকে তাঁদের সাহিত্যে ধারণ করতে চাইলেন। যে কারণে চেতনাপ্রবাহরীতি হয়ে উঠল তাঁদের একমাত্র অন্বিষ্ট । ষাটের দশকের শক্তিমান কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস [১৯৪৩-১৯৯৭] তাঁর গল্প-শরীরে চেতনাপ্রবাহরীতি রূপায়ণে তাঁদেরই যোগ্য উত্তরসূরী। চরিত্রের মনোগহনস্থিত চেতনার গতিকে ধারণ করতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই তিনি তাঁর ছোটগল্পের করণকৌশলে বিন্যস্ত করে দিয়েছেন চেতনাপ্রবাহরীতি। ইলিয়াসের ছোটগল্পের চরিত্রগুলো তাদের জটিল মনস্তত্ত্ব, আবেগী সত্তা, উন্মুলিত মানসগহনে সৃষ্ট ক্ষত, সমাজ-বিবিক্ত নিঃসঙ্গতা, পলায়নপরতা, অবদমিত আকাঙ্ক্ষা-নিঃসৃত কষ্টবোধের অভিঘাতে বার বার চেতনার বিবরে ডুব দিয়েছে, যে চেতনা মুহূর্তে মুহূর্তে কালপরম্পরা ভেঙে বিচরণ করেছে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের অগম্য পটে। ভাবনার বিষয় হলো, কেন তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলোর অন্বিষ্ট হয়ে উঠল চেতনার বিবরে বিচরণ? ভাবনার সঙ্গে সঙ্গে উত্তরও হয়ত মেলে ! ইলিয়াস যে কালে গল্প লিখেছেন, সে কালের সমাজ প্রতিবেশের দিকে চোখ ফেরালে উপলব্ধ হবে কালটি ছিল উত্তাল। ১৯৫৮-এর আইয়ুবি সামরিক শাসন এবং তার ফলে পূর্ববাংলার ওপর আরোপিত মৌলিক গণতন্ত্রের { Basic Democracy] শৃঙ্খল, পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক পূর্ববাংলার ওপর শোষণ-নির্যাতন, পূর্ববাংলাকে পশ্চিম পাকিস্তানের কাঁচামাল সংগ্রহ ও শিল্পদ্রব্য বিক্রয়ের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার প্রভৃতির ফলে এটি ছিল একাত্তরের মুক্তিসংগ্রাম দানা বেঁধে ওঠার কাল। একালের “বুর্জোয়া মানবতাবাদী ও মার্কসীয় মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর সামনে দেখা দিল সঙ্কট। অবিকশিত সমাজের বুদ্ধিজীবী হিসেবে তাঁদের সামনে খোলা থাকল তিনটি পথ— ১. পাক-শাসক চক্রের সঙ্গে আপসের; কিংবা ২. বিপ্লবের, অথবা ৩. সমাজ জীবন ও ইতিহাসের পথচ্যুত হয়ে আত্মবিরে পলায়নের। “ইতিহাসের গতিতে নয়, তাঁদের দৃষ্টি, মন ও মনন-সংযুক্ত হল প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর অবক্ষয়িত ইয়োরোপীয় মধ্যবিত্ত ও পেটি বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীদের ব্যক্তিপ্রতিক্রিয়াজাত সাহিত্যভাবনা ও শিল্পরীতিতে"।" ইলিয়াস ষাটের দশকের এই উত্তাল কাল-প্রতিবেশে গল্প রচনা করেছেন এবং ধারণ করেছেন সেই কাল-বৈশিষ্ট্যকে প্রগাঢ়ভাবে। আর সম্ভবত সে-কারণেই একজন মার্কসবাদী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর গল্পে গণমানুষের পরিবর্তে উপজীব্য হয়ে উঠেছে ব্যক্তিমানুষের অন্তর্লীন চেতনা এবং চেতনার প্রবহমানতা। কেননা ‘সমাজ-সংগঠন যদি হয় শ্রেণীবিভক্ত, জটিল, দ্বিধাগ্রস্ত ও দ্বন্দ্বক্ষুব্ধ চৈতন্যপ্রবাহও হবে তার নিঃসন্দেহে অনুগামী'' এর সত্যতা নিহিত এ রীতির আবির্ভাবকালে । চেতন্যপ্রবাহরীতি-আশ্রয়ী সাহিত্যিকগোষ্ঠীর আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল একাত্তরের মতোই এক ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ কালে - প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময় প্রতিবেশে।
Downloads
Downloads