সূর্য-দীঘল বাড়ী : অপরাজেয় জীবনালেখ্য
Abstract
'যে দুঃসময়ে সময়ের গ্রন্থি ভেঙে যায়, তখনই ঔপন্যাসিকদের উপন্যাস লেখার সুসময়'।'—- দেবেশ রায়ের এ মন্তব্যে বিভ্রান্তির অবকাশ থেকে যায়; আপাতদৃষ্টে মনে হতে পারে, সমাজ বা মানবজীবনের দুঃসময় ঔপন্যাসিকদের উপন্যাস লেখার সুসময় কিন্তু প্রকৃত অর্থে মানুষের দুঃখে সুখী নন ঔপন্যাসিকেরা বরং ভয়ংকর দুঃসময়ে মানবতার স্ফুরণ বা জীবন-সংগ্রাম অথবা দুঃসময়কে কাটিয়ে নতুন করে বাঁচার স্পৃহায় ভেঙে পড়া মানুষের আবারও দৃঢ় হয়ে ওঠা মানবজীবনের এই ইতিবাচকতাকে তারা তাদের উপন্যাসের ফ্রেমে ধারণ করবার চেষ্টা করেন। পরাজয় নয়, ধ্বংস নয়, ধ্বংসের মধ্য দিয়ে যে সৃষ্টির সূচনা তাই তাদের অন্বিষ্ট। কথাসাহিত্যিক আবু ইসহাক তাঁর কালজয়ী উপন্যাস সূর্য-দীঘল বাড়ী (১৯৫৫) রচনা করেছেন ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ-পরবর্তী জীবনসংগ্রামের কাহিনী নিয়ে। উপন্যাসের মূলকাঠামোয় দুর্ভিক্ষের আলাপন অল্প হলেও গৌণ নয়; বর্ণিত জীবনের পরতে পরতে দুর্ভিক্ষের স্মৃতির বিভীষিকা স্পষ্ট। দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে অপরাজেয় জীবনের অনুপম আলেখ্য নির্মাণ করেছেন ঔপন্যাসিক। সূর্য-দীঘল বাড়ী উপন্যাসের আলোচনায় ১৯৪৩- এর দুর্ভিক্ষ, যা পঞ্চাশের মন্বন্তর নামে পরিচিত, তার আলোচনা খুবই প্রাসঙ্গিক । ১৯৪৩ সালে বাংলার জনসমাজ কেঁপে উঠেছিল মানুষের তৈরি এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের আঘাতে। সে আঘাতের চিহ্ন বাংলার জনমানসে স্থায়ী হয়েছিল বেশ কয়েক দশক ধরে । জনসাধারণের স্বার্থ উপেক্ষা করে ইংরেজ সরকার যখন ক্ষেতের ধান আর নৌকা দখল করে নিজেদের যুদ্ধের প্রয়োজন মেটাচ্ছিল; চাল রপ্তানি করছিল ; যখন জোতদার আর মজুতদারেরা সীমাহীন লাভের মোহে বিপুল পরিমাণ ধান মজুত করে চলেছিল সে- সময় দেশে সৃষ্টি হয়েছিল এক কৃত্রিম খাদ্য সংকট। ১৯৪২ সালের নভেম্বর মাসে যেখানে ধান বিক্রি হয়েছিল চৌদ্দ আনা মণ দরে, সেখানে মাত্র তিন মাসের মধ্যে সেই চালের দর তিন টাকা মণ থেকে ছাপ্পান্ন টাকায় পৌঁছেছিল । তারপরই দেখা দেয় শতাব্দীর করুণতম দৃশ্য। লক্ষ লক্ষ কঙ্কালসার মানুষ একটু খাবারের খোঁজে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে কিংবা শহরের দিকে যাত্রা করেছে পথেই ঢলে পড়েছে ক্ষিধেয় এবং প্রাণবায়ু নিঃশেষ হবার আগেই তাদের দেহ ছিঁড়ে খেয়েছে শেয়াল, শকুনের দল । কোন কোন মহলের হিসেব মতে ১৯৪৩ সালের অক্টোবরে মৃত্যুর হার দৈনিক পঞ্চাশ হাজার ছাড়িয়েছিল। সেই নিদারুণ সময়ের বর্ণনা পাওয়া যায় ইতিহাসে, পাওয়া যায় বাংলার সংবেদনশীল লেখকদের লেখায়, চিত্রশিল্পীদের চিত্রকর্মে, পাওয়া যায় সাহিত্যে।
Downloads
Downloads