মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র অভিধান চর্চা
Abstract
মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্কে (১৮৮৫-১৯৬৯) 'প্রাচ্যবিদ্যা-কল্পদ্রুম' নামে অভিহিত করেছিলেন তাঁর সমকালের অন্য এক খ্যাতিমান পণ্ডিত মুহম্মদ এনামুল হক।' কল্পদ্রুম হলো স্বর্গের একটি বৃক্ষ, যার কাছে প্রার্থনা করা মাত্র সবকিছু পাওয়া যায়। এই অর্থ কাজে লাগিয়ে সংস্কৃত ভাষার একাধিক অভিধানের নামের শেষাংশে ‘কল্পদ্রুম' শব্দটি যোগ করা হয়, যেমন-তেরো শতকে বোপদেবের 'কবিকল্পদ্রুম' অথবা উনিশ শতকের রাধাকান্ত দেব প্রণীত এবং বাংলা বর্ণমালায় মুদ্রিত আট খণ্ডের 'শব্দকল্পদ্রুম'। 'শব্দকল্পদ্রুম' শব্দের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় 'বিদ্যাকল্পদ্রুম' নামেও একটি কোষগ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন। তাই মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্কে 'প্রাচ্যবিদ্যা-কল্পদ্রুম' বলার অর্থ তাঁকে অসাধারণ পণ্ডিত তথা প্রাসঙ্গিক বিষয়ে সর্বজ্ঞ বিবেচনা করা। কিন্তু একই সাথে লক্ষণীয়, 'কল্পদ্রুম' শব্দটি তাঁর নামের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার ফলে তিনি প্রতিতুলিত হন একটি অভিধানের সঙ্গে। অভিধানের সঙ্গে প্রতিতুলিত মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ বাস্তব জীবনে অভিধান চর্চার সঙ্গে নিজেকে কতটা সংশ্লিষ্ট করেছিলেন, নিশ্চয়ই তা অনুসন্ধানের দাবি করতে পারে। যতটা জানা যায়, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ মোট তিনটি অভিধানের প্রণয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। এগুলোর মধ্যে একটি ১৯৬৫ সালে বাংলা একাডেমী থেকে তাঁর সম্পাদনায় পূর্ব পাকিস্তানের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান নামে ৩ খণ্ডে প্রকাশিত হয়। এই অভিধানের ২য় সংস্করণ মুদ্রিত হয় ১৯৭৩ সালে দুই খণ্ডে এবং ৩য় সংস্করণ মুদ্রিত হয় ১৯৯৩ সালে অভিন্ন খণ্ডে। অন্য দুটি অভিধানের একটির নাম বাংলা একাডেমীর ব্যবহারিক বাংলা অভিধান এবং অন্যটি করাচীস্থ কেন্দ্রীয় উর্দু উন্নয়ন বোর্ডের উর্দু-অভিধান। ১৯৬১ সালের জুলাই মাস থেকে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ব্যবহারিক বাংলা অভিধান প্রণয়নের কাজ শুরু করেন। এ লক্ষ্যে তিনি সংকলন ও সম্পাদনার নীতিমালা তৈরি করেছিলেন। কিন্তু ১৯৭৪ সালে যখন এর প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়, তখন সে অভিধানের কোথাও তাঁর প্রাসঙ্গিক অবদানের কথা উল্লিখিত হয় নি। কেন্দ্রীয় উর্দু উন্নয়ন বোর্ডের উর্দু- অভিধানের ক্ষেত্রেও ব্যবহারিক অভিধানের মতো হয়েছিল বলে মনে হয়। অন্তত তাঁর জীবনীগ্রন্থ থেকে এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না, যাতে মনে হতে পারে যে, এই অভিধানের সম্পাদক হিসেবে তাঁর নাম মুদ্রিত হয়েছিল। অথচ এই অভিধানের জন্যও তিনি প্রচুর পরিশ্রম করেছিলেন। বিশেষভাবে ১৯৫৯ সালের এপ্রিল মাস থেকে ১৯৬০ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত তিনি এই অভিধানের আলিফ ও বে অংশের মধ্যকার প্রায় দেড় হাজার শব্দের ব্যুৎপত্তি নির্ণয় করে দিয়েছিলেন। মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ বিখ্যাত একটি প্রবন্ধের নাম : “বাঙ্গালা অভিধানে আমোদ”।" শব্দের ব্যুৎপত্তি আলোচনায় আনন্দ—এমন ধারণা প্রবন্ধটি পাঠ করার পর তৈরি হয়। ব্যুৎপত্তি নিঃসন্দেহে অভিধান সম্পাদনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু অভিধান সম্পাদনার ক্লান্তিকর দিকগুলোও রয়েছে, যেমন— বানান ঠিক করা, প্রয়োগবাক্য দেখে অর্থ নির্ণয় করা, ব্যাকরণগত তথ্যাদি পরিবেশন করা, সর্বোপরি নির্ভুল করার লক্ষ্যে প্রতিবার প্রুফ দেখার সময়ে পরিমার্জনার কাজ করা। এসব করতে গিয়ে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ঠিক কতটা এবং কী পরিমাণ আনন্দ উপভোগ করেছিলেন, তা জানার কোনো উপায় নেই। প্রাপ্ত তথ্যাদির আলোকে একাধিক অভিধান সম্পাদনার কাজে তাঁর অংশগ্রহণের প্রকৃতি সম্পর্কে শুধু অনুমান করা যায়, চূড়ান্তভাবে কিছু বলা যায় না।
Downloads
Downloads