রবীন্দ্রনাথের গীতি-নৃত্যনাট্য : আধুনিক সংগীতের সূচনা
Abstract
প্রত্যেক জীবন্ত সত্তা তার আপন অস্তিত্বের দ্যুতি ছড়িয়ে বিকশিত হতে চায়। প্রকৃতি অবশ্য স্বাধীনতার এমন সূত্রকে সবসময় সমর্থন করে না। তাই কেউ কারুর মুখাপেক্ষী অথবা কারুর প্রতি কেউ বিমুখ এই ধর্ম শাসন করে বা আধিপত্যের মেজাজ নিয়েই প্রকৃতি নিজের ভারসাম্য রক্ষা করে; শিল্প-সংস্কৃতির ধরনেও এমন বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ভারতীয় সংগীতে গীত-বাদ্য-নৃত্য একে অন্যের অনুগামী ছিল, এখন প্রত্যেকেই স্বতন্ত্র শিল্পসত্তা । প্রাচীন নাট্যরীতি যেমন গীতি ও সুরলীলায় আচ্ছাদিত ছিল, আধুনিক নাটকে এসে সেই আসন দখল করেছে গদ্য-সংলাপের আহ্লাদ। আবার কোনো কোনো নাট্যধারা এমনও হয়েছে যে, সুরে লীলায়িত হতে হতে তার স্বকীয় অভিনয়রীতিই হারিয়ে ফেলেছে, যেমন ইউরোপীয় 'অপেরা'। শিল্পের এই নিয়তি সভ্যতা ও প্রকৃতির বিবর্তনের ওপর বা একে অপরের আধিপত্যের ওপর নির্ভরশীল । প্রকৃতির নিয়মেই মাঝে মাঝে এমন সব বিস্ময়কর প্রতিভার আবির্ভাব ঘটে যে, পূর্বপ্রতিষ্ঠিত ধারা-ধারণাকে তা ভেঙেচুরে নতুন যুগের সূচনা করে। আধুনিক নাট্যগীতির আসরে ইউরোপে রিচার্ড বাগনার (১৮১৩-১৮৮৩) এবং ভারতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) তেমনই দুই মহীরুহ। উভয়েই প্রচলিত ধারার সংস্কার সাধন করতে গিয়ে নতুন শিল্পরূপের সূচনা করেন। স্বাগনার অপেরাকে গীতি-আধিক্য থেকে মুক্ত করে তাকে সাংগীতিক-নাট্যে (Musical Drama) রূপান্তর করেন, যা ইউরোপীয় নাট্যজগৎকে করেছে গৌরবান্বিত; আর প্রাচ্যে রবীন্দ্রনাথ নাটক করতে গিয়ে সংগীতের মিশ্রণে অভিনব প্রয়োগ দেখিয়ে পক্ষান্তরে সংগীত জগৎকে নতুন দিগন্তে উন্মোচিত করেন । যে সকল বিষয় আধুনিক সংগীতকে আলাদারূপে চিনতে শিখিয়েছে, তার প্রেক্ষাপট সবসময় রচয়িতার বিষয় নির্বাচনের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিভা দিয়েই বিশেষায়িত হয় নি; নতুন কোনো শিল্পমাধ্যমের সাথে বোঝাপড়া করতে গিয়ে হয়তো বেরিয়ে এসেছে ফর্মের নতুনত্ব, উঁকি দিয়েছে বিশেষত্ব; পরবর্তীকালে তা সুদীর্ঘ চর্চায় ব্যাপ্ত ও বিকশিত হয়েছে। যেমন চলচ্চিত্র; শতবর্ষ আগে মাধ্যমটির অঙ্কুরোদগম হলো মাত্র। অথচ ক্রমবিকাশের পথে তার নিজস্ব ভাষা নির্মিত হতে গিয়ে সেখান থেকে আরও বেশকিছু শাখা-প্রশাখা বের হয়ে এখন নতুন শিল্পমাধ্যম হিসেবে প্রস্ফুটিত হয়েছে। আধুনিক গানও এক অর্থে চলচ্চিত্রেরই বাইপ্রোডাক্ট – অবশ্য এটা সর্বজনস্বীকৃত নয় ।
Downloads