নজরুলের যুগবাণী: আঙ্গিক বিবেচনার নব প্রস্তাবনা
Abstract
কাজী নজরুল ইসলামের (১৮৯৯-১৯৭৬) বিচিত্রমাত্রিক সাহিত্যকর্মের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উপেক্ষিত-অবহেলিত সাহিত্যরূপটি নিঃসন্দেহে তাঁর প্রবন্ধ। কবি হিসেবে যিনি সাধারণ পাঠক ও বোদ্ধাজন, বিজ্ঞ সমালোচকমহলের নিকট থেকে 'বিদ্রোহী কবি', 'জাতীয় কবি', 'যুগকবি', 'রবীন্দ্র-যুগের প্রথম মৌলিক কবি', 'বাংলা সাহিত্যের অন্যতম যুগ-প্রবর্তক কবি', 'জাতীয় মহাকবি'সহ অসংখ্য বিশেষণে অভিধায় পরিস্নাত, তিনি-ই যে প্রবন্ধের শিল্পমান সৃষ্টিতে অতি সাধারণ ও নগণ্য – এরূপ বিভ্রান্তিমূলক ধারণা পোষণের জন্য তাঁর সচেতন পাঠককে অধিক কায়-ক্লেশ স্বীকারের প্রয়োজন হয় না। কারণ, নজরুলের জীবনী ও সাহিত্য-মূল্যায়ন বিষয়ক প্রামাণ্য গ্রন্থসমূহের 'সূচি'-অংশে দৃষ্টিপাত করলেই এ সত্য উপলব্ধি করা সম্ভব। কবি হিসেবে তিনি খুব দ্রুতই বাঙালি-মানসের অশেষ বন্দনা ও শ্রদ্ধা- ভালোবাসার পাত্রে পরিণত হয়েছেন এবং তাঁকে নিয়ে রচিত বিবিধ গ্রন্থের সংখ্যাও ক্রমবর্ধমান। অথচ তাঁর রচিত প্রবন্ধের শিল্পমান বিবেচনা প্রসঙ্গে সমালোচকমহল বিস্ময়করভাবে নীরব। এর অন্তরালে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কিছু গৎবাঁধা ধারণা বলবৎ রয়েছে। প্রথমত, নজরুলের বিভিন্ন প্রবন্ধ-সংকলনের অন্তর্গত রচনাসমূহ মূলত একাধিক পত্রিকার সম্পাদকীয় কলাম, যা দীর্ঘ সময়ের পরিশীলন ও যুক্তি-মননের পরিচর্যা ব্যতীতই লিখিত। দ্বিতীয়ত, এসব রচনার প্রেক্ষাপট ও প্রসঙ্গ সমকালের বিভিন্ন রাজনৈতিক- অর্থনৈতিক-সামাজিক ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় লিখিত। তৃতীয়ত, প্রবল আবেগোচ্ছ্বাস ও ভাবোন্মাদনাবশত প্রচারধর্মিতার উদ্দেশ্যে তিনি রচনার শিল্পমানকে অগ্রাহ্য করে কাব্যধর্মী ভাষায়, বজ্রকণ্ঠে অলংকার ও বিশেষণের বাহুল্য প্রয়োগের দ্বারা অত্যল্প সময়ে যে গদ্যরচনা (প্রবন্ধ) পাঠকের নিকট উপস্থাপন করেন, তা কোনোভাবেই কালজয়ী ও যুগোত্তীর্ণ প্রবন্ধসাহিত্যের অন্তর্গত হতে পারে না। চতুর্থত, এসব প্রবন্ধের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যই ছিল সাধারণ মানুষের নিকট বিশেষ বক্তব্য পরিবেশন ও তাৎক্ষণিকতার প্রয়োজন মেটানো। পঞ্চমত, তাঁর এ ধরনের রচনায় আশ্রিত ভাষাভঙ্গিতে যুক্তি, শৃঙ্খলা, সংযম ও অনুশীলনের সতর্কতা অনুপস্থিত। তাই এসব গদ্যরচনা অধিকাংশ সমালোচককেই নিরুৎসাহিত করেছে তাঁর প্রবন্ধ-সংকলনসমূহের শিল্পমান ও গদ্যরীতির প্রাতিস্বিকতা অনুধাবনে, নির্দেশে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে নজরুল-বিষয়ক প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা আড়াই শতাধিকের বেশি হলেও হাতে গোনা কয়েকটি প্রবন্ধ-সংকলন ও পত্রিকা, সাময়িকীতে নজরুলের প্রবন্ধ আলোচনার প্রতিপাদ্যরূপে বিবেচিত হয়েছে। এখানেও কথা থেকেই যায়। কারণ, যে সীমিত সংখ্যক গবেষণা, সমালোচনা গ্রন্থ, সংকলন-সাময়িকীতে নজরুলের উপর্যুক্ত সম্পাদকীয় কলামসমূহ সমালোচিত-বিশ্লেষিত হয়েছে, সেখানেও গবেষক-সমালোচকদের আলোচনার প্রতিপাদ্য হয়েছে উক্ত রচনাসমূহের ভাববস্তু।
Downloads