রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর প্রবন্ধ : বিজ্ঞান থেকে দর্শনে
Abstract
বৈজ্ঞানিক দুরূহ তত্ত্ব অবলম্বন করে রচিত রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর প্রবন্ধগুলো বিষয়ভাবনার গুণে তাঁর কালে হয়েছিল অভিনব। হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের স্থূল মর্ম বইটি সম্পাদনা প্রসঙ্গে ত্রিবেদী যদিও বলেছিলেন, বাঙ্গালা ভাষা এখনও বিজ্ঞান প্রচারের উপযোগী হয় নাই। বিজ্ঞানের বাঙ্গালা এখনও গড়িয়া তুলিতে হইবে। ভাষার অভাবে এখনও বিজ্ঞানের গ্রন্থ লিখিতে কেহ সাহস করে না। লিখিলেই রচনা অপাঠ্য অবোধ্য হইয়া উঠে।' কিন্তু রামেন্দ্রসুন্দরের বিজ্ঞানবিষয়ক প্রবন্ধের সংখ্যাই বেশি এবং প্রকাশের সাফল্য তিনি অর্জন করতে পেরেছিলেন এসব প্রবন্ধ ঘিরেই। জ্ঞান-পিপাসাকে অনিবার্য করে বিজ্ঞান-অনুরাগ সৃষ্টি এবং তা থেকে দর্শনভাবনায় স্থিত হতে চেয়েছেন রামেন্দ্রসুন্দর। অনুসন্ধিৎসু সত্তার বড়ো যে গুণ, সেই জিজ্ঞাসাবোধকে তিনি বহন করেছেন সারাজীবন। আর তার মীমাংসাসূত্র আবিষ্কারেই দর্শনে তাঁর আগ্রহ। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দর্শন এবং বিজ্ঞানের সমন্বয় তিনি করতে চেয়েছেন সচেতন নৈপুণ্যে। বলা হয়, “রামেন্দ্রসুন্দর দার্শনিকের মতো চিন্তা করেছেন, বৈজ্ঞানিকের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে তাকে বিন্যাস করেছেন এবং শেষে সাহিত্যিকের বোধ দিয়ে তা প্রকাশ করেছেন।” তিনি নিজে বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন এবং সে কারণে তাঁর বিজ্ঞান-পরিশীলিত নৈর্ব্যক্তিক সংস্কারমুক্ত শিক্ষা ও বুদ্ধির দ্বারা প্রাকৃত জগতের নিগূঢ় মর্মরহস্য-সম্পর্কিত তত্ত্ব এবং তথ্য গভীরভাবে অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ত্রিবেদীর অধিকাংশ বিজ্ঞানবিষয়ক প্রবন্ধের সঙ্গে প্রধানত দুটি বিষয়ের যোগ ছিল — প্রাণতত্ত্ব এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান। এই দুই বিষয়ের গবেষণা অবস্থা সেকালে কীরূপ ছিল, সে- সম্পর্কে কিছু বলে নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, প্রাকৃতিক নির্বাচনের ভেতর দিয়ে ভূ-পৃষ্ঠে প্রাণের অভিব্যক্তি কীভাবে ঘটে, সে-বিষয়ে চার্লস ডারউইনের যুগান্তকারী গবেষণাগ্রন্থ 'অরিজিন অব স্পিসিজ' (Origin of species) প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৫৯ সালে, ত্রিবেদীর জন্মেরও (১৮৬৪) বছর পাঁচেক আগে। তারপরে বারো-চৌদ্দ বছর ধরে সেই তত্ত্ব ক্রমশ পরিমার্জিত হয় এবং বিশেষজ্ঞমহলে স্বীকৃতিও পায়। সাধারণভাবে বিবর্তন বলতে বোঝায় অনবরত ছোট ছোট বদলের মধ্য দিয়ে জীবের দীর্ঘ ক্রমবিকাশ। ডারউইন বিবর্তনের সপক্ষে বিপুল সাক্ষ্য উপস্থিত করেন। বিবর্তনের বাস্তব পন্থা হিসেবে তিনি দাঁড় করান ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন'কে। তিনি বলেন, আকস্মিক বদলের ফলে একাধিক জাতিরূপ (genotype) পাওয়া যাবে। অর্থাৎ কিছু জাতক থাকবে যাদের শরীরে বদল হয়েছে, আবার অনেক জাতক থাকতে পারে যাদের কোনো বদল হয়নি। এদের মধ্যে যারা পরিবেশের সঙ্গে নিজেদেরও সহজে মানিয়ে নিতে পারবে তারা বেঁচে থাকবে এবং দ্রুত বংশবৃদ্ধি করতে পারবে। অন্যেরা সেই অনুপাতে সংখ্যাবৃদ্ধি করতে পারবে না এবং শেষ পর্যন্ত লোপ পাবে। একেই ডারউইন বলেছেন 'প্রাকৃতিক নির্বাচন'। আধুনিক প্রাণতত্ত্বের এটা একেবারে শুরুর কথা। বস্তুত খাদ্যের স্বল্পতা ও সীমাবদ্ধতা এবং জন্মহারের অতিবৃদ্ধি পর্যায়ে ম্যালথাস সে পদ্ধতি উপস্থাপন করেছিলেন, তা ছিল শুধু মানব বংশ-সম্পর্কিত । ডারউইন সে তত্ত্বকেই জীবজগৎ পর্যন্ত সম্প্রসারিত করে দিয়েছেন। বিষয়টি পরবর্তীকালে দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্রে যথেষ্ট অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। অর্থাৎ যেকোনো ভাবেই হোক না কেন সমকালীন চিন্তায় এর প্রভাব বহুমাত্রিক।
Downloads
Downloads
Published
Issue
Section
License
Copyright (c) 2024 সাহিত্য পত্রিকা

This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivatives 4.0 International License.