বুদ্ধদেব বসু-র কালসন্ধ্যা : সৃষ্টি-ধ্বংস-পুনরুজ্জীবনের শিল্প
Abstract
ক্রমাগ্রসর যান্ত্রিকতায় আধুনিক মানুষের চেতনার শাসন ও শুশ্রূষায় মিথ যেমন এক আশ্চর্য বিশল্যকরণী, তেমনি কাব্যনাটকও আধুনিক শিল্পের বিচিত্র দ্বন্দ্ব ও জিজ্ঞাসার অনন্য সমন্বয়ক এক মাধ্যম – যেখানে বস্তুজগৎ ও চেতনাজগৎ, আবেগ-অনুভূতি ও দ্বন্দ্ব-সংকট, দৃশ্যলোক ও শ্রুতিলোক পরস্পরের ঘনিষ্ঠতর পরিপূরক। বিংশ শতাব্দীতে প্রথম কাব্যনাটক ও মিথ একাত্ম হয় টি.এস. এলিয়টের (১৮১৮- ১৯৬৫) সূত্রে। 'ঐতিহ্য' ও 'কাব্যনাটক' দুটি বিষয় নিয়েই তিনি গভীরভাবে অনুসন্ধান করেন এবং দুয়ের সংযোগে আধুনিককালে শিল্পের নতুন মাত্রা ও সম্ভাবনাকে সূচিত করেন তাঁর Murder in the Cathedral (১৯৩৫), The Family Reunion (১৯৩৯), The Cocktail Party (১৯৪৯) প্রভৃতি রচনায়। একই শতাব্দীতে বাংলা সাহিত্যে মিথাশ্রয়ী কাব্যনাটককে যিনি প্রতিষ্ঠিত করেন ঐশ্বর্য ও উৎকর্ষের নানা মাত্রিকতায়, তিনি বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৪)। স্বাধ্যায় ও সৃষ্টিশীলতার গভীর সামঞ্জস্যে নির্মিত তাঁর মৌলিক পাঁচটি মিথাশ্রয়ী কাব্যনাটক – তপস্বী ও তরিঙ্গণী (১৯৬৬), কালসন্ধ্যা (১৯৬৯), অনাম্নী অঙ্গনা (১৯৭০) প্রথম পার্থ (১৯৭০) ও সংক্রান্তি (১৯৭৩)। শিল্পসাহিত্যে মিথ ব্যবহারের ক্ষেত্রে আধুনিক সাহিত্যিকদের সাথে বুদ্ধদেব বসুর সূক্ষ্ম পার্থক্য এখানে যে, অন্যরা সমকালকে মুখ্য বিবেচনায় রেখে পুরাণের প্রচ্ছদমাত্র গ্রহণ করেন আর বুদ্ধদেব পুরাণ থেকে অর্জন করেন বাস্তব জ্ঞান এবং সমকালের সাথে তার বহমানতাকে যুক্ত করে একটি বৃহৎ জীবন-চেতনাকে প্রতিষ্ঠা করেন। বুদ্ধদেব বসুর ভাষায়, মহাভারত 'কোনো সুদূরবর্তী ধূসর, স্থবির উপাখ্যান নয়, আবহমান মানবজীবনের মধ্যে প্রবহমান।' ফলে বুদ্ধদেব বসুর কাব্যনাটকে এই প্রবহমান জীবন-অস্তিত্বের বিনির্মাণ ঘটে অবরোহ পদ্ধতিতে, যা অন্যান্য শিল্পীর ক্ষেত্রে সাধারণত আরোহী। তাঁর মিথ চেতনা আমূল পরিবর্তনে বিশ্বাসী নয়, বরং একটি ধারাবাহিক বিবর্তনমূলক সত্তায় আস্থাবান জীবনের একটি পুরাবৃত্ত সৃষ্টিতে আগ্রহী।
Downloads
Downloads