রবীন্দ্রনাথের 'খাপছাড়া'
Abstract
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে বাংলা ছড়ার বন্ধন তাঁর শৈশব থেকেই। শিশু রবি গড়ে উঠেছিলেন কিশোরী চাটুজ্জের ছড়া, বিষ্ণুর পাড়াগেঁয়ে ছড়া, কৈলাস মুখুজ্জের ছড়ার মধ্যে। 'বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর'-এর চার ছত্র তাঁর বাল্যকালের মেঘদূতস্বরূপ। এ বন্ধন আরও দৃঢ় হয় ত্রিশোর্ধ্ব রবীন্দ্রনাথের ছড়া-সংগ্রহ, অন্যকে ছড়া-সংগ্রহে উদ্বুদ্ধ করা, ছড়ার বৈশিষ্ট্য ও ছন্দ নিয়ে প্রবন্ধ রচনা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে। তাঁর কাব্যধারায় সোনার তরী (১৮৯৪) থেকে বিশেষভাবে এর প্রভাব লক্ষ করা যায়। শিশু (১৯০৩) ও শিশু ভোলানাথ (১৯২২)-এ এ-প্রভাব হয়ে ওঠে প্রত্যক্ষ। তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছড়া-চর্চা নতুন মাত্রা পায় কবির ৭৫ বছর বয়সে। পরিণত রূপান্তরে নতুন অবয়বে ছড়া ফিরে আসে তাঁর লেখনীতে। ইতোমধ্যে বাংলা ছড়া ঈশ্বর গুপ্তের “তুমি মা কল্পতরু”-র ছায়া থেকে বেরিয়ে এসেছে। যোগীন্দ্রনাথ সরকার খুকুমণির ছড়া (১৮৯৯)-য় উপস্থাপন করেন প্রায় ৮০০ লোকছড়া, যা পরবর্তী সময়ে বাংলা ছড়ার আঙ্গিক-গঠনে নির্ণায়কের ভূমিকা পালন করে। শুধু সংকলন নয়, যোগীন্দ্রনাথ দু'খণ্ডের হাসিখুসি (১৮৯৭, ১৯০৪), হাসি ও খেলা (১৮৯১), রাঙা ছবি (১৮৯৬), ছড়া ও ছবি (তা.বি.), খেলার সাথী (১৮৯৮), হাশিরাশি (১৮৯৯) প্রভৃতিতে ছড়ার চর্চা করে হিজিবিজি (১৯১৬)-তে আবির্ভূত হন বাংলার প্রথম আধুনিক ছড়াকার রূপে। আজগুবি-উদ্ভট কল্পনা, ব্যঙ্গকৌতুক, চিত্রধর্মী পদ্য প্রভৃতি লক্ষণের কারণে হিজিবিজি-কে বিনা দ্বিধায় আবোল তাবোল (১৯২৩)-এর পূর্বপুরুষ বলা যায়। যোগীন্দ্রনাথের এই ছড়াচর্চার মধ্যে পাঠকের হাতে আসে মনমোহন সেনের খোকার দপ্তর (১৯০২)। অন্যদিকে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ছড়ার ছন্দ ব্যবহার করেন বেণু ও বীণা (১৯০৬), তীর্থরেণু (১৯১০) ও কুহু ও কেকা (১৯১২)-য়। প্রকাশিত হয় শিবনাথ শাস্ত্রীর মুকুল (১৮৯৫), উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর সন্দেশ (১৯১৩) এবং সুধীর চন্দ্র সরকার সম্পাদিত মৌচাক (১৯২০)। সন্দেশ-এর পাতাতেই (১৯১৩-২৩) সুকুমার রায় বাংলা ছড়াকে পূর্ণরূপে আবিষ্কার ও উপস্থাপন করেন; পরে এগুলো আবোল তাবোল (১৯২৩) ও খাই খাই (১৯৫০)-তে গ্রন্থভুক্ত হয়। সুনিপুণ শব্দবিন্যাস ও নতুন শব্দ তৈরি, অনুপ্রাস-প্রধান ছন্দ ব্যবহার, যমক ও ধ্বনিঝংকার, মিল ও তালের অপূর্ব সমন্বয়, শ্লেষমিশ্রিত ব্যঙ্গ ও কৌতুক এবং অদ্ভূত ও আজগুবি বিষয় নিয়ে বাংলায় শুদ্ধ ছড়ার জগৎ সুকুমারই প্রথম তৈরি করেন। সুকুমার রায়সহ রায়চৌধুরী পরিবার গড়ে উঠেছিল ঠাকুরবাড়ির আবহে, সুকুমারের ওপর রবীন্দ্রনাথের প্রভাবও ছিল প্রত্যক্ষ। বিশ শতকের বিশের দশকেই সুকুমার রায় বাংলা ছড়ার প্রমিতায়ন সম্পন্ন করেন। দশকের শেষ দিকে প্রকাশিত হয় সুনির্মল বসুর ছন্দ ও ছড়ার প্রশিক্ষণের গ্রন্থ ছন্দের টুংটাং (১৯২৯)। বিশের দশকের এই পটভূমিতেই ত্রিশের দ্বিতীয়ার্ধে রবীন্দ্রনাথের বাংলা ছড়ার অঙ্গনে বিচরণ।
Downloads
Downloads