অবয়ব ভাষাবিজ্ঞানের ভূমিকা : ঢাকাই ভাষা-অবয়ব বিশ্লেষণ
Abstract
অবয়ব ভাষাবিজ্ঞান (corpus linguistics)-এর মূল কাজ একটি ভাষা সম্পর্কিত সকল প্রকার পাঠকৃতির (text) বস্তুনিষ্ঠ ও নির্ভরযোগ্য নমুনা সংগ্রহ করে সেগুলো বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে ওই ভাষার প্রকৃতি ও পরিচয় নির্ণয় করা। অবয়ব-ভাষাবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে নমুনা হিসেবে ভাষার কথ্য ও লেখ্য উভয় প্রকার পাঠকৃতিকেই বিবেচনা করা হয়ে থাকে । প্রাত্যহিক জীবনে ব্যবহৃত ভাষা-নমুনা, ভাষীদের পারস্পরিক কথোপকথন, আনুষ্ঠানিক কিংবা অনানুষ্ঠানিক সংলাপ, বক্তব্য, সাক্ষাৎকার – এগুলো যেমন ভাষা-অবয়বের অংশ তেমনি দৈনন্দিনের লিখিত নথি, পত্রিকা, সাহিত্য প্রভৃতিও এর আওতাভুক্ত। বিশেষ করে লোকসাহিত্যের সঙ্গে ভাষার স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশের নিবিড় সম্পর্ক থাকায় বিভিন্ন লোকসাহিত্যিক অনুষঙ্গ অবয়ব-ভাষাবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের উপকরণ রূপে বিবেচিত হয়ে থাকে। তবে, সাহিত্য ছাড়াও ভাষার বিভিন্ন কথ্য ও লেখ্য নমুনাকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে এই জাতীয় গবেষণায় পর্যবেক্ষণ করা হয়ে থাকে। বস্তুত অবয়ব ভাষাবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক লক্ষ্য হিসেবে কাজ করে প্রধানত দুটি বিষয় : একটি হলো, ভাষীদের দৈনন্দিন যোগাযোগের প্রজ্ঞানমূলক (cognitive) বৈশিষ্ট্য কীরূপ তা বিচার করা এবং অপরটি হলো, ভাষা প্রক্রিয়াকরণে বিশেষত আধুনিককালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সৃজনে সংশ্লিষ্ট ভাষা- অবয়ব (corpus)-কে ব্যবহার করা। এই সূত্র ধরে বলা যায় যে, অবয়ব ভাষাবিজ্ঞানের সঙ্গে তাই কম্পিউটার প্রযুক্তির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান। একদিকে, একটি ভাষার ভাষা- অবয়ব তৈরিতে এই প্রযুক্তি ব্যাপক সহায়তা প্রদান করে থাকে; অপরদিকে, প্রাকৃতিক ভাষা প্রক্রিয়াকরণে (natural language processing)-র প্রধান উপাত্ত উৎস হিসেবে সক্রিয় থাকে ওই ভাষার প্রস্তুতকৃত ভাষা-অবয়ব। এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের ভাষা গবেষণা পরিচালনা করতে গেলে সংশ্লিষ্ট ভাষা-অবয়ব বিভিন্ন তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য প্রদানে সহায়তা দান করে থাকে। সুতরাং, কোনো ভাষার একটি সাধারণ ভাষা-অবয়ব প্রস্তুত করা সম্ভব হলে, তা ওই ভাষার বিভিন্ন ভাষাবৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্য নিরূপণে বিশেষ সাহায্য করে। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, এখন পর্যন্ত বাংলা ভাষায় বিশাল পরিসরে এ ধরনের কোনো উদ্যোগ গৃহীত হয়নি। যদিও উপনিবেশের কাল থেকেই বিভিন্ন মনীষীর ব্যক্তিগত দূরদর্শিতা ও উদ্যোগে বাংলা শব্দ সম্ভার তৈরির প্রচেষ্টা গৃহীত হয়েছে, তবুও এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, দীর্ঘসময়ব্যাপী, সুপরিকল্পিত বিজ্ঞানসম্মত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ব্যতীত কখনোই একটি ভাষার পূর্ণাঙ্গ ভাষা-অবয়ব প্রস্তুতি সম্ভব নয়। বিশেষ করে বাংলা ভাষার মতো একটি সমৃদ্ধ ভাষা, যার ভাষীর সংখ্যা বিশাল, সেরকম একটি ভাষার ভাষা অবয়ব নির্মাণ নিঃসন্দেহে একটি বিরাট বিষয়। বর্তমান প্রবন্ধে আমরা মূলত অবয়ব ভাষাবিজ্ঞানের বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব তুলে ধরে বাংলাদেশের ঢাকা নগরের অন্যতম উপভাষার অবয়ব-ভাষাবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে সচেষ্ট হব। এ প্রবন্ধে একে ‘ঢাকাই ভাষা' বলে অভিহিত করা হবে। বলে নেওয়া প্রয়োজন যে, ঢাকাই ভাষা বলতে মোটা দাগে মহানগরী ঢাকার ‘পুরনো ঢাকা' অংশে ব্যবহৃত কথ্যভাষাকেই বোঝানো হয়ে থাকে। সাম্প্রতিককালে, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির উদ্যোগে প্রকাশিত গ্রন্থে উল্লিখিত ঢাকাই ভাষার সংগৃহীত বিভিন্ন ভাষা-নমুনা সংকলিত হয়েছে। যদিও একে ঢাকাই ভাষার কোনো পূর্ণাঙ্গ ভাষা-অবয়ব বলা যাবে না, তবে আমাদের জানা মতে, এটিই এখন পর্যন্ত এই উপভাষা বিষয়ক নমুনার সবচেয়ে বড় সংগ্রহ। বর্তমান প্রবন্ধে ঢাকাই ভাষার অবয়ব-ভাষাবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের আকর রূপে ব্যবহৃত হবে উল্লিখিত গ্রন্থে উপস্থাপিত ও সংকলিত ভাষা-নমুনাসমূহ। আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে অবয়ব ভাষাবিজ্ঞান বিষয়ক আলোচনা শেষে আমরা ঢাকাই উপভাষা বিশ্লেষণে নিয়েজিত হব।
Downloads
Downloads