“ঘাটের কথা” : রবীন্দ্র-গল্পশৈলীর চিহ্নবিশ্ব
Abstract
ঘাটের কথামালা (discourse) নিয়ে গড়ে উঠেছে রবীন্দ্র ছোটগল্প “ঘাটের কথা”। স্মরণ রাখা প্রাসঙ্গিক হবে যে, ষোল বছর বয়সে লেখা “ভিখারিনী"-র মধ্য দিয়ে তাঁর ছোটগল্পের যাত্রা শুরু। “ভিখারিনী" গল্পটিকে শনাক্ত করা হয়েছে রবীন্দ্র-ছোটগল্পের 'অবিরল উত্তাপ- উৎস'রূপে। আমরা এই মত অস্বীকার না করে এর অধিকতর সম্প্রসারণে আগ্রহী। আমাদের বিবেচনায়, “ভিখারিনী” রবীন্দ্র-ছোটগল্পের খেরো খাতা। রবীন্দ্রনাথ ছোটগল্প নিয়ে যা ভেবেছেন, তার খসড়া পরিকল্পনাটি পাওয়া যায় এই গল্পে। নানা ধরনের ছোটগাল্পিক অনুষঙ্গ তথা প্যারাডাইমগুচ্ছ তিনি জড়ো করেছেন এখানে; এর কিছু হয়ে উঠেছে শিল্পী রবীন্দ্রনাথের আজীবনের সঙ্গী, কিছু গোড়াতেই বাতিল হয়ে গেছে। আমরা মনে করি, গ্রহণ-বর্জনের এই খসড়া আয়োজনকে পরিপাটি করে শিল্প- ঋদ্ধ ছোটগল্প রচনার ছাঁচটি (matrix) গড়ে উঠেছে রবীন্দ্রনাথের “ঘাটের কথা” গল্পে। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প রচনার প্রারম্ভ পর্যায়ের এই গল্পে লেখক অণু-অবয়বে উপস্থাপন করেছেন তাঁর গল্প-পরিকল্পনার বিভিন্ন অনুষঙ্গ। “ভিখারিনী”-তে যারা উপস্থিত, “ঘাটের কথা”-য় তারা শিল্পঋদ্ধভাবে উপস্থাপিত; ভবিষ্যৎ-ব্যবহারের সম্ভাবনায় সংহত। এই সুদূরপ্রসারী অনুষঙ্গসমূহ গল্পটির শৈলীবৈজ্ঞানিক ( stylistic) কাঠামোকে আশ্রয় করে পরিকল্পিত এবং উত্তরকালে রচিত বিভিন্ন রবীন্দ্র-গল্পে ব্যবহৃত হবার সম্ভাবনায় শৈলী-চিহ্ন রূপে আলোচ্য গল্পের পাঠে সংরক্ষিত হয়েছে। গল্পের শৈলী সংশ্লিষ্ট এই চিহ্নসমূহ একত্র হয়ে সৃষ্টি করেছে এক নান্দনিক চিহ্নবিশ্ব (semiosphere), যা গল্পটির কথামালার এক বিশেষ তাৎপর্যবাহী বিশেষত্ব। অর্থাৎ সহজ করে বললে, সমগ্র রবীন্দ্র-ছোটগল্পের কথামালায় শৈলীগত পরিচর্যার অংশ হিসেবে যেসকল শিল্পকৌশল লক্ষ করা যায়, তাদের অনেকগুলোই চিহ্ন (sign) আকারে দ্যোতিত হয়েছে আলোচ্য “ঘাটের কথা” গল্পে। এই চিহ্নগুলো পরস্পর-সম্পর্কিত, এবং সম্মিলিতভাবে এরা হয়ে উঠেছে রবীন্দ্র-গল্পশৈলীর দ্যোতনার (signification) প্রতিনিধি; এতে করে জন্ম নিয়েছে গল্পশৈলীর চিহ্নবিশ্ব । উল্লিখিত এই অনুকল্পকে (hypothesis) সপ্রমাণ উপস্থাপন করাই বর্তমান প্রবন্ধে আমাদের অভীষ্ট। এক নজরে আলোচ্য গল্পটিকে বিবেচনা করলে দেখতে পাওয়া যাবে যে, অপেক্ষাকৃত সরল ও সংক্ষিপ্ত কাহিনিসূত্রকে অবলম্বন করে রচিত হয়েছে এর পাঠ (text)। এতে একজন সর্বজ্ঞ, সর্বদ্রষ্টার চরিত্রে আবির্ভূত হয়েছে গঙ্গার নদীঘাট। প্রতীকী তাৎপর্যে বিন্যস্ত এই ঘাটের সরব উপস্থিতি লেখক জবানিকে ছাপিয়ে গিয়ে গল্পের নাম-চরিত্রে পরিণত হয়েছে। কেবল কথক-এর গণ্ডিতে নিজেকে না বেঁধে গল্পের ঘটনা-পরম্পরার সঙ্গে সে এমনভাবে মিশে গেছে যে, তার বস্তুজাগতিক জড়-অস্তিত্ব সম্পর্কে পাঠক ক্রমশ বিস্মৃত হতে বাধ্য হন। ফলে, গল্পটির সাদামাটা ন্যারেটিভ পাঠকের কাছে তাৎপর্যবাহী সংবেদনা সঞ্চারের চাইতে এর আনুষঙ্গিক শৈলী-বৈশিষ্ট্য, বিশেষত ঘাট-চরিত্রটির বয়নকৌশল পাঠককে মুগ্ধ করে রাখতে তৎপর থাকে। পাঠকের এই শিল্প-মুগ্ধতার উত্তর-প্রভাব রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন ছোটগল্পে সম্প্রসারিত হয়েছে — এই অভিমতের যৌক্তিক মীমাংসার পূর্বে শৈলী ও চিহ্নের তাত্ত্বিক কাঠামো বিষয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন।
Downloads
Downloads
Published
Issue
Section
License
Copyright (c) 2012 সাহিত্য পত্রিকা

This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivatives 4.0 International License.