শামসুর রাহমানের কবিতায় প্রেম ও নারী
Abstract
প্রেম, নারী ও সৌন্দর্য শামসুর রাহমানের কবিসত্তার মৌল প্রেরণা বলা চলে। তাঁর সৃষ্টির সিংহভাগ জুড়েই রয়েছে প্রেমের কবিতা। কবির মৃত্যুর পর অনুজপ্রতিম আরেক কবি শহীদ কাদরী (জ. ১৯৪২) মন্তব্য করেছিলেন, 'তিনি যদি রাজনীতি-সচেতন নাও হতেন, শুধু তাঁর প্রেমের কবিতাগুলোর জন্যেই স্মরণীয় থাকবেন।' প্রকৃতপক্ষে শামসুর রাহমান তাঁর কবিজীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রেমের কবিতা রচনা করে গেছেন। সেসব কবিতা কখনো হংস বলাকার মতো ঝাঁকে ঝাঁকে এসে তাঁর কাব্যভূমিকে মুখর ও আনন্দবেগে উদ্বেল করে তুলেছে, আবার কখনো বিরূপ পরিপার্শ্বের চাপে প্রেমাবেগ প্রতিসরিত হয়েছে জনসংলগ্নতায়। তাই প্রেমের কবিতা তখন জন্মেছে কম। প্রেমাবেগ প্রকাশের প্রথম পর্যায়ে তরুণ কবি সলজ্জ, ভীরু, কিন্তু পরবর্তীকালে প্রৌঢ় কবি আবেগ প্রকাশে অকুণ্ঠ, উচ্চকণ্ঠ, এমন কি কখনো তা তীব্র আবেগে সংরক্ত। বুদ্ধদেব বসুর কঙ্কাবতী কিংবা জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন, শঙ্খমালা কিংবা বিষ্ণু দে-র লিলি, ডলু এমন কি লুই আরাগঁর এলসার মত কোনো নায়িকার সাক্ষাৎ শামসুর রাহমানের প্রেমের কবিতায় পাওয়া যায় না। যা থেকে বোঝা যায় কবিতায় কোনো বিশেষ নারীমূর্তি কিংবা নায়িকা তৈরি করতে তিনি ততটা উৎসাহী ছিলেন না। পক্ষান্তরে তাঁর কবিতায় একাধিক নারীর উপস্থিতি অনুভব করা যায়, যা কবির বাস্তব অভিজ্ঞতাজাতও হতে পারে, কিংবা হতে পারে পুরোটাই শিল্পসৃষ্টির লক্ষ্যে কল্পিত। প্রেমের ক্ষেত্রে শামসুর রাহমান শরীর কিংবা হৃদয় কোনোটারই আধিপত্যে বিশ্বাসী ছিলেন না, অর্থাৎ শরীরসর্বস্ব প্রেম কিংবা শরীরবিবর্জিত প্রেম কোনোটিই তাঁর প্রেমচেতনায় একক বসতি স্থাপন করে নি। এই দুয়ের সম্মিলনে প্রেমের পূর্ণতা আসে বলেই তিনি মনে করতেন। তাঁর কবিতার ভূভাগে যেসব নারীর পদচারণা লক্ষিত হয় তারা প্রত্যেকেই আধুনিক, নাগরিক ফ্ল্যাটে তাদের বাস, গৃহ ও আপন দেহের সজ্জায় সুরুচিশীল, শিল্প-সাহিত্য ও জ্ঞানগর্ভ আলোচনায় সপ্রতিভ অর্থাৎ তারা বিদুষী এবং শিল্পবোধসম্পন্ন, রেস্তোরাঁ ও পাঁচতারা হোটেলের লবিতেও তাদের কারো কারো সঙ্গে কবির সাক্ষাৎ ঘটে, কখনো বা দেখা হয় কোনো অভিজাত এলাকায় এলিট শ্রেণির নৈশ পার্টিতে। টেলিফোনে প্রেমালাপে বিশেষ পটু তারা। প্রেমের কোনো পরিণামের জন্যে তারা কাতর নন। এদের কারো কারো আবার স্বামী-পুত্র-কন্যা নিয়ে আপাত সুখী সংসার রয়েছে। প্রৌঢ় কবিকে বয়সের ব্যবধান অতিক্রম করেও কেউ কেউ তাঁকে গ্রহণ করেছেন অপরিসীম প্রেমে, জাগিয়েছেন তাঁর মধ্যে মৃত্যুঞ্জয়ী চেতনা। তবে শামসুর রাহমানের নারীরা শহরবাসী হলেও তাদের রূপমাধুরী বর্ণনায় প্রায় সর্বত্রই তিনি প্রকৃতিলগ্ন। সেই নারীদের অনিন্দ্যসুন্দর রূপরাশি প্রকৃতির নানা অনুষঙ্গেই কবি ফুটিয়ে তুলেছেন। শামসুর রাহমানের প্রেমচেতনার আরেকটি লক্ষণীয় দিক হলো তাঁর কবিতায় প্রায়ই কবিতা ও প্রেমিকা এবং দেশ ও দয়িতা অভিন্ন রূপ পায়। জীবনের জন্যে ভালোবাসাকে কবি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশ্বাস করতেন।
Downloads
Downloads