গণআন্দোলন ও পার্টি-রাজনীতি : চিলেকোঠার সেপাই-র অভিজ্ঞতা
Abstract
চিলেকোঠার সেপাই উপন্যাসের বিষয় বাংলাদেশের ইতিহাসের এক সুপরিচিত অধ্যায় – উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান। সত্তরের নির্বাচন আর একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সাথে কার্যকারণ- সম্পর্কে যুক্ত এই অভ্যুত্থানের ঘটনাক্রম ও জাতীয়তাবাদী তাৎপর্য লেখক এ উপন্যাসে বিশ্বস্ত ভঙ্গিতেই তুলে এনেছেন। তাতে প্রভাবশালী পার্টিগুলোর কার্যক্রম যেমন উঠে এসেছে, তেমনি শহর-গ্রামের আলাদা বাস্তবতাও চিহ্নিত হয়েছে। ইলিয়াস তাঁর বিশিষ্ট ভাষাভঙ্গি, অতুলনীয় ডিটেইল আর জীবনদৃষ্টির স্বাতন্ত্রে বহুস্তর ইতিহাসকে অনায়াসেই আঁটিয়ে নিয়েছেন উপন্যাসের আদলে। ইতিহাসকে উপন্যাসে রূপান্তরের সময় স্বভাবতই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে লেখকের মূল্যায়ন ও পক্ষপাত। উপন্যাসসুলভ নিরাসক্তি অক্ষুণ্ণ রেখেই লেখক দেখিয়েছেন, পার্টি-রাজনীতি ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের দিক থেকে উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান সফল হলেও গণআন্দোলনের মধ্যে বিচিত্র শ্রেণি-পেশার মানুষের যে আকাঙ্ক্ষা আর সম্ভাবনা জেগে উঠেছিল, তা সফল হতে পারেনি। ক্ষমতালিপ্সু আপসকামী পার্টি-রাজনীতিই এর প্রধান কারণ। অন্য কারণ মধ্যবিত্তের অপ্রস্তুতি। এ উপন্যাসে গণআন্দোলনের যে সংজ্ঞায়ন ঘটেছে, আন্দোলনের সূচনা ও সমাপ্তিতে পার্টি-রাজনীতির ভূমিকা আর উত্তুঙ্গ মুহূর্তগুলোতে আম-জনতার সক্রিয়তা যেভাবে চিহ্নিত হয়েছে, তা এক ‘বেহাত বিপ্লবে’র কথাই বলে৷ স্পষ্টতই শ্রেণি-রাজনীতির প্রতিই লেখকের পক্ষপাত। কিন্তু এই পক্ষপাত শ্রেণি-রাজনীতির বিপ্লবী তত্ত্বের ভিতে দাঁড়ায়নি। বরং বিদ্যমান ব্যবস্থার বহুমাত্রিক অন্যায্যতাই উৎপাদন ও বণ্টনে বুর্জোয়া-বিধির স্বচ্ছতা আর যুক্তির অনুপস্থিতি তাঁর সিদ্ধান্তের ভিত্তি। বিদ্যমান জাতীয়তাবাদী পার্টি-রাজনীতি কর্মসূচির সীমাবদ্ধতার কারণেই এই অন্যায্যতার প্রতিকার করতে পারবে না। যাদের সেই কর্মসূচি আছে, তারা কি পারবে? ইলিয়াস এ প্রশ্নে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি। কিন্তু গণ-মানুষের মুক্তির রাজনীতির কিছু তত্ত্বীয়-প্রায়োগিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা আছে চিলেকোঠার সেপাই উপন্যাসে, যেখানে দেখা যায়, শ্রেণি-রাজনীতি কেবল জ্ঞানগত ফায়সালার ব্যাপার নয়, বরং গভীরভাবে সাংস্কৃতিক ও জীবনযাপনপদ্ধতির ব্যাপার। গণআন্দোলনে জেগে ওঠা সম্ভাবনার নিরিখে নতুন পার্টি- রাজনীতির তত্ত্বায়নচেষ্টা এ উপন্যাসের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
Downloads
Downloads