আত্মনির্মাণে রবীন্দ্রনাথের মৃণাল
Abstract
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) ছোটগল্পসমূহের মধ্যে ‘স্ত্রীর পত্র' (১৯১৪) অন্যতম মনস্তাত্ত্বিক গল্প। এই গল্পের প্রধান নারী চরিত্র মৃণাল, মেজোবউ-এর জীর্ণ খোলস ছিন্ন করে আবিষ্কার করেছিল নিজেকে ব্যক্তিমানুষ হিসেবে। সাতাশ বছরের মৃণাল কলকাতার সাতাশ নম্বর মাখন বড়ালের গলির নিরাপত্তা ছেড়ে মুক্তি খুঁজেছিল উন্মুক্ত আকাশের নিচে। সে আকাশ বৃহৎ পৃথিবীর আকাশ, তার আপন আকাশ । বাঙালি সমাজের বহুকাল লালিত মূল্যবোধকে অস্বীকার করে সে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের পতাকা উড়িয়ে দেয়। বাংলা সাহিত্যে মৃণাল দুজন। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের মৃণাল ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের গৃহদাহ (১৯২০) উপন্যাসের মৃণাল। অবশ্য রবীন্দ্রনাথ তাঁর স্ত্রী ভবতারিণীর° নাম পাল্টে রেখেছিলেন মৃণালিনী দেবী। নামটি রবীন্দ্রনাথের এক অতি প্রিয় নাম 'নলিনী'র' প্রতিশব্দ। তিনি বিভিন্ন অনুষঙ্গে নামটি ব্যবহার করেছেন। ‘স্ত্রীর পত্র' গল্পের মৃণালের মধ্যে আধুনিক নারীর যে প্রতিবাদী স্পৃহা তুলে ধরেছেন রবীন্দ্রনাথ, সেটা তার এই প্রিয় নামকে উল্লেখ করে উপস্থাপন করা হয়েছে। একথা স্বাভাবিকভাবে মনে হতে পারে রবীন্দ্রনাথ এই প্রতিবাদের সঙ্গে সম্পূর্ণ একাত্ম ছিলেন। তাই 'মৃণাল' শুধু একটি নারী চরিত্র হিসেবে থাকল না, এটা যেন রবীন্দ্রনাথের নিজেরও প্রতিবাদ। ‘স্ত্রীর পত্র' গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল প্রমথ চৌধুরীর সম্পাদনায় প্রকাশিত সবুজপত্র পত্রিকার শ্রাবণ ১৩২১ সংখ্যায়। চলিত ভাষারীতিতে লেখা 'এই গল্পে নারীর অধিকার ও স্বাধীনতাকে ভিন্নমাত্রায় উপস্থাপন করেন রবীন্দ্রনাথ' (সৌমিত্র, ২০১২ : ৮৮)। পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীর সামাজিক ও পারিবারিক অবস্থানকে এ গল্প তুলে ধরা হয়েছে। মৃণালের ব্যক্তিত্ব ও স্বাতন্ত্র্য প্রচলিত সমাজবিধির প্রতি কখনো বেদনায়, কখনো তিরস্কারে, কখনো ব্যঙ্গে জ্বলে উঠেছে (নীপা, ২০০৪ : ৮৮)। রবীন্দ্রনাথের তেপ্পান্ন বছর বয়সে লেখা এই গল্পেই ভারতবর্ষের সাহিত্যের ইতিহাসে 'নারীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের অধিকার সর্বপ্রথম খোলাখুলিভাবে দাবী করা হয়' (হুমায়ুন, ২০০০: ৬৯)। গল্পটি রচনার শতবর্ষে আজকের সামাজিক প্রেক্ষাপটেও গল্পটির প্রাসঙ্গিকতা অনেকখানি। এই পাঠে মৃণাল কীভাবে নিজের স্বাধীন মানবসত্তাকে আবিষ্কার করে আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে উঠেছিল তা বিশ্লেষিত হয়েছে।
Downloads
Downloads