হাসান আজিজুল হকের গল্পে সামরিক শাসনকালীন বাস্তবতা
Abstract
১৯৪৭ সালে দেশভাগের মাধ্যমে নবসৃষ্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মলগ্নেই শাসনতন্ত্রিক সংকট তৈরি হয়েছিল। এই রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা মুহম্মদ আলী জিন্নাহ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তনের পরিবর্তে সম্পূর্ণ একক ইচ্ছানির্ভর একটি শাসন কাঠামো চালু করেন। গণতন্ত্রের পরিবর্তে স্বৈরতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্রের যে বীজ তিনি বপন করেন, ধীরে ধীরে তা রীতিতে পরিণত হয় । এই রীতির পথ ধরেই আইয়ুব খান ও ইয়াহিয়া খানের মতো সামরিক শাসকেরা পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করেছিলেন অবলীলায় ও নির্বিবাদে। সামরিক শাসকেরা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার নানা অপকৌশল অবলম্বন করেন। আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্রের ধারণাটি এ ধরনের একটি অপকৌশল মাত্র। এ সব অপকৌশলের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল এ দেশের জনগণ। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনই ধীরে ধীরে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনে রূপ নেয়। দীর্ঘ স্বাধিকার আন্দোলন অবশেষে স্বাধীনতা যুদ্ধে গিয়ে ঠেকে । নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের। স্বাধীনতার স্থপতির নেতৃত্বে গঠিত হয় গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের সরকার। কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের বাস্তবসম্মত সুযোগ তিনি বেশিদিন পাননি। নতুন দেশের শরীরে রক্ত, ক্লেদ, খুন, ঘৃণার গন্ধ না ফুরাতেই দেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে (১৯২০-১৯৭৫) সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। ক্ষমতা গ্রহণকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় নানা ষড়যন্ত্র। খুব অল্প দিনের মধ্যেই সেনাবাহিনী ক্ষমতা গ্রহণ করে পরিপূর্ণভাবে। পরবর্তীকালে সামরিক শাসক কর্তৃক রাজনৈতিক দলগঠনের মধ্য দিয়ে চিরদিনের জন্য জাতিকে দ্বিধা বিভক্তির দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। সেনাশাসক পাকিস্তানি রীতিকে অনুসরণ করেন এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতি পুনঃপ্রবর্তন করেন। গণবিচ্ছিন্ন সরকার নিজস্ব মাস্তানবাহিনী ও আমলার উপরে অধিক মাত্রায় নির্ভরশীল ছিল। ফলে সমস্ত দেশজুড়ে অরাজকতা, লুটপাট, খুন, গুম চলে সরকারের ছত্রছায়ায়। রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগে সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতির সর্বত্র দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সুবিধাবাদীদের প্রাদুর্ভাব বাড়ে। তারা মূলত পাকিস্তানি শাসকচক্রেরই উত্তরাধিকার। এক দশকের মধ্যেই দেশের অর্ধেকের বেশি পরিবার ভূমিহীন ও আশিভাগের মতো মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যায়। অন্যদিকে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় কোটিপতির সংখ্যা। বাস্তবতার সরল সমীকরণে ভয়ানক গরমিল সৃষ্টি হয়। স্বাধীনতার পরে আবার দেশের জনগণকে দেড়দশক ধরে সেনাশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই পরিচালনা করতে হয়। হাসান আজিজুল হকের পাতালে হাসপাতালে (১৯৮১) গল্পগ্রন্থের “সাক্ষাৎকার”, “পাতালে হাসপাতালে” ও “খনন”; আমরা অপেক্ষা করছি (১৯৮৯)' গল্পগ্রন্থের “সম্মুখে শান্তি পারাবার”, “পাবলিক সার্ভেন্ট”, ও “অচিন পাখি”; বিধবাদের কথা ও অন্যান্য গল্প গ্রন্থের “ভূতের ভবিষ্যৎ” প্রভৃতি গল্পের বিষয় সামরিক শাসনকালীন বাস্তবতা। এসব গল্পে তিনি সামরিক শাসনের প্রকৃত রূপ উন্মোচন করেন।
Downloads
Downloads
Published
Issue
Section
License
Copyright (c) 2015 সাহিত্য পত্রিকা - Shahitto Potrika | University of Dhaka

This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivatives 4.0 International License.