জয়দেব ও গীতগোবিন্দ
Abstract
জয়দেবের জীবনী সম্বন্ধে যে সকল বিবরণ পাওয়া যায় তাহার অধিকাংশই কিংবদন্তীমূলক। সমস্ত কিংবদন্তীর যে ঐতিহাসিক মূল্য আছে তাহা মনে হয় না; কিন্তু এই গল্পগুলির একটি উপকারিত৷ আছে। ইহাদের আড়ালে জয়দেবের যে চিত্র ফুটিয়া উঠিয়াছে তাহ। তথ্যমাত্রদর্শী ঐতিহাসিকের গ্রহণযোগ্য না হইতে পারে, কিন্তু ইহা হইতে পরবর্ত্তী সময়ে বৈষ্ণব ভক্তেরা তাঁহাকে ও তাঁহার কাব্যকে কিরূপ প্রীতি ও শ্রদ্ধার চক্ষে দেখিতেন তাহা স্পষ্ট বুঝিতে পারা যায়। এ সকল কাহিনী ছাড়িয়া দিলে, কবির কাবাই তাঁহাকে জানিবার ও বুঝিবার আমাদের একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তাঁহার কাব্য হইতে তাঁহার ব্যবহারিক জীবনের কথা বেশি কিছু জানা যায় না। যে শেষ শ্লোকে কবি কিঞ্চিৎ আত্মপরিচয় দিয়াছেন তাহা আবার সকল পুঁথিতে পাওয়া যায় না। রাণা কুম্ভের রসিকপ্রিয়া টীকাতে ইহার ব্যাখ্যা নাই ; কিন্তু প্রাচীন কাশ্মীরী ও নেপালী পুঁথিতে এই শ্লোকটি রহিয়াছে। এই শ্লোক হইতে জানা যায়, কবির পিতার নাম ভোজদেব, মাতার নাম বামাদেবী (পাঠান্তরে রামাদেবী বা রাধাদেবী), এবং পরাশর প্রভৃতি প্রিয়বন্ধুর প্রীত্যর্থে গীতগোবিন্দ রচিত হইয়াছিল। প্রথম সর্গের ‘পদ্মাবতী-চরণ-চারণ-চক্রবর্ত্তী” এবং দশম সর্গের ‘জয়তি পদ্মাবতীরমণ-জয়দেবকবি-ভারতী-ভণিতমতি-শাত’—এই দুই পদ হইতে অনেকে অনুমান করেন যে, জয়দেবের পত্নীর নাম ছিল পদ্মাবতী। শঙ্কর তাঁহার টাকায় উভয়ত্র এইরূপ ব্যাখ্যাই করিয়াছেন। প্রাচীন টীকাকার ধৃতিদাস লিখিয়াছেন-‘পদ্মাবতী নাম জয়দেবস্য ভার্যা'। যদিও পূজারী গোস্বামীর টীকায় প্রথম-উদ্ধৃত পদের এরূপ ব্যাখ্যা করা হয় নাই, তথাপি দ্বিতীয় পদটির ব্যাখ্যায় তিনি ‘তথানায়ী জয়দেবপত্নী' এইরূপ লিখিয়াছেন। কিন্তু মুম্বই নির্ণয়সাগর যন্ত্রের সংস্করণে উপরোক্ত দ্বিতীয় পদটির ভিন্ন পাঠ ধরা হইয়াছে, তাহাতে পদ্মাবতীর নামোল্লেখমাত্র নাই; যথা—‘জয়তি জয়দেব-কবি-ভারতী-ভূষিতম্' ইত্যাদি। এই প্রসঙ্গে আরও উল্লেখযোগ্য, রাণা কুম্ভের রসিকপ্রিয়া টীকায় 'পদ্মাবতী-চরণ-চারণ-চক্রবর্ত্তী' পদটির উল্লিখিত ব্যক্তিগত ব্যাখ্যার প্রতিবাদ করিয়া বলা হইয়াছে যে, পদ্মাবতী শব্দের দ্বারা এখানে কেবল পঢ়াহস্ত৷ দেবী লক্ষ্মীর নির্দ্দেশ বুঝিতে হইবে। যাহা হউক, প্রাচীন টীকাকারগণের মধ্যে এইরূপ মতভেদ থাকিলেও, যে ঐতিহ্য লইয়৷ পদ্মাবতী জয়দেব-পত্নীর নাম বলিয়া গৃহীত হইয়াছে তাহা এত সুপরিচিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত যে ইহা নিতান্ত অমূলক নয় বলিয়াই মনে হয়। কেন্দুবিল্ব যে কবির জন্মস্থান তাহ৷ তৃতীয় সর্গের একটি পদ হইতে অনুমিত হয়। এই কেন্দুবিল্ব বীরভূম জেলার অন্তর্গত অজয় নদীর তীরবর্ত্তী কেঁদুলি গ্রাম এইরূপ প্রসিদ্ধি আছে ; এবং এখনও এই গ্রামে জয়দেবের উদ্দেশে প্রতি বৎসর পৌষ সংক্রান্তিতে উৎসব হইয়া থাকে। যে পদটিতে কেন্দুবিশ্বের উল্লেখ রহিয়াছে, তাহাতে জয়দেবকে বলা হইয়াছে 'কেন্দুবিল্ব - সমুদ্রোদ্ভব-রোহিণীরমণ' অর্থাৎ ‘কেন্দুবিল্বরূপ সমুদ্র হইতে উত্থিত চন্দ্র’। কিন্তু সাধারণভাবে চন্দ্র-অর্থে প্রযুক্ত রোহিণীরমণ এই শব্দের মধ্যে কোনও সাম্প্রদায়িক ব্যাখ্যাকার দেখিয়াছেন—জয়দেবের রোহিণী নায়ী সহজ-সাধিকার ইঙ্গিত!
Downloads
Downloads
Published
Issue
Section
License
Copyright (c) 1981 সাহিত্য পত্রিকা

This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivatives 4.0 International License.